হোম > খেলা

একটি ফোন—আপনি অলিম্পিক থেকে পদত্যাগ করেন, নইলে...

বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনে সৃষ্ট অস্থিরতা

এম. এম. কায়সার

ফোন বাজছে।

স্ক্রিনে নামটা দেখে রিসিভ বাটনে আঙুল রাখলেন এক ক্রীড়া সংগঠক। সালাম হলো, কুশল বিনিময়ও হলো। এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এমন সৌজন্যের পর সাধারণত আসে খেলাধুলার গল্প, কোনো আসরের খবর, কোনো ফেডারেশনের ঝামেলা। এবার তা এলো না। ওপাশের মানুষটি সোজা কাজের কথায় চলে গেলেন। অলিম্পিকে তারা পরিবর্তন চান। তাই কাউন্সিলরের পদটা এই সংগঠককে ছেড়ে দিতে হবে। স্বেচ্ছায়। সঙ্গে জুড়ে দিলেন ছোট একটি বাক্য, যার ওজন অনেক। এটা নাকি শুধু তার একার নয়, ‘আমাদের’ চাওয়া। এই ‘আমরা’ কারা, তা অবশ্য খোলসা করা হয়নি। কিছু কথা না বলাই ভালো। শ্রোতা নিজেই বুঝে নেবেন, ওপাশে কতটা শক্তি দাঁড়িয়ে আছে।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) একাধিক কাউন্সিলরের কাছে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রায় একই সুরের ফোন গেছে। কাউকে সরাসরি। কাউকে আবার কাছের কোনো শুভাকাঙ্ক্ষীকে দিয়ে, যাতে বার্তাটা বন্ধুত্বের মোড়কে পৌঁছায়। বার্তা এক, কণ্ঠে হুমকির ঝাঁজ। আমার দেশ-এর কাছে এর তথ্যগত প্রমাণ আছে। এ-ও জানা গেছে, ফোন পেয়ে সবাই মাথা নোয়াননি। কয়েকজন তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দিয়েছেন, পদ তারা ছাড়বেন না। অর্থাৎ ভয় দেখানো হয়েছে, কিন্তু সবাই ভয় পাননি। এটুকুই এই গল্পের একমাত্র আশার জায়গা, আর সেটাও ছোট।

এই ফোনকর্তার নাম জাহেদ পারভেজ চৌধুরী। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) ক্রীড়া পরিচালক। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই চাকরি পেয়েছেন, নিয়োগ দিয়েছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। একটি সরকারি সংস্থার চেয়ারে বসে একজন কর্মকর্তা একটি সংস্থার নির্বাচিত কমিটিকে পদ ছাড়তে বলছেন, দৃশ্যটাই অস্বস্তিকর। ক্ষমতার আসনে বসা মানুষের একটা ফোনকে কতটা ‘অনুরোধ’ আর কতটা ‘হুমকি’ বলা যায়, তা যাচাই করতে খুব বেশি বুদ্ধি খরচের প্রয়োজন নেই। যার কাছে ফোন গেছে, তার কাছে তা অনুরোধ হয়ে ওঠে না। এবার প্রশ্নটা সোজা। নির্বাচিত কাউন্সিলররা দায়বদ্ধ কার কাছে? এনএসসির করিডোরে দপ্তর সাজিয়ে বসে থাকা কোনো ফোনকর্তার কাছে কি? ভোটের মূল্য যদি একটা ফোনকলের চেয়ে কম হয়, তাহলে নির্বাচন নাটক করার দরকারই বা কী ছিল?

সাম্প্রতিক সময়ে অলিম্পিকের কাউন্সিলরদের কাছে এমন ফোন করা এনএসসির সেই ক্রীড়া পরিচালক জাহেদ পারভেজ চৌধুরীর বক্তব্য নিতে আমার দেশ-এর ক্রীড়া প্রতিবেদক গোটা দিন চেষ্টা করেছেন। তাকে ফোন করা হয়েছে। তিনি ফোন ধরেননি। মেসেজ তার কাছে পৌঁছেছে কিন্তু তিনি কোনো জবাব দেননি। পল্টনে তার অফিসে গিয়ে দেখা গেল দরজায় পাহারা। ভেতরে খবর পাঠানো হলো, সাড়া মিলল না। প্রতিবেদক বসে রইলেন কক্ষের সামনে। সময় গড়াল। তিনি অফিস থেকে বেরোনোর মুখে কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে তার কাছে প্রতিবেদক সময় চাইলেন মাত্র দুই মিনিট। উত্তর এলো, ব্যস্ত আছি। তাহলে অন্তত লিফটে নামার সময়টুকুতে এক মিনিট? সেটাও না। সামান্য সময়টুকুও তিনি প্রশ্নের জন্য বরাদ্দ করতে রাজি হননি। লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার সময় ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ‘কথা বলব না’ বলে চলে যান।

এই লুকোচুরির যুক্তি পরিষ্কার। হুমকি দেননি বললে তথ্যপ্রমাণের সামনে কথাটা মিথ্যা হয়ে দাঁড়াবে। দিয়েছি বললে মানতে হবে, তিনি অলিম্পিক আন্দোলনের স্বায়ত্তশাসনের নীতির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে গেছেন। দুই পথই বন্ধ। তাই বাকি থাকে পালানো। যে কর্মকর্তা নির্বাচিত মানুষদের পদ ছাড়ার নির্দেশ দিতে দ্বিধা করেন না, সাংবাদিকের দুটি প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোর সাহস তার নেই। ক্ষমতা তার কাছে ফোনে দাপট দেখানোর হাতিয়ার, জবাবদিহির জিনিস নয়। জনগণের দপ্তরে বসে জনগণের প্রশ্নকে এড়িয়ে চলা কোনো নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন তা একটি জাতীয় ক্রীড়া সংস্থার ভিত নাড়ায়, তখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।

ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগের মিছিল

এবার বাকি ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখা যাক। গত মঙ্গলবার বিওএর দপ্তরে জমা পড়ল তিনটি পদত্যাগপত্র। পদ ছাড়লেন সহসভাপতি ও বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি শারওয়াত সিরাজ শুক্লা। সঙ্গে সাবেক ফুটবলার রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বির আর জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান। পরদিন বুধবার গেলেন আরো তিনজন। তাদের মধ্যে আছেন হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ, রোয়িং ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম এবং উপমহাসচিব ও বক্সিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এমএ কুদ্দুস খান। বৃহস্পতিবার আরো তিনজন। তিন দিনে ৯ জন বিদায় নিলেন ৩৭ সদস্যের নির্বাহী কমিটি থেকে। অর্থাৎ প্রতি চারজনে প্রায় একজন। এ কোনো ঝরে পড়া নয়, এটা প্যাটার্ন। তালিকা যত লম্বা হচ্ছে, প্রশ্নও তত ভারী হচ্ছে।

কারণ জানতে চাইলে উত্তর প্রায় এক- ‘ব্যক্তিগত’! এর বেশি কেউ বলতে নারাজ। কেউ কেউ শুধু ইঙ্গিত দিচ্ছেন, আরো অনেকে যাবেন। একযোগে এভাবে কাউন্সিলর পদ থেকে পদত্যাগের প্যাটার্ন এবং পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণের মিল—এই দুইয়ের যোগসূত্র এক করলে উত্তর মিলছে এটা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। পরিকল্পিত পরিকল্পনার অংশ বিশেষ!

যারা ভয় পেয়েছেন, তারা মুখ খুলছেন না। যারা মুখ খুলতে পারতেন, তারা চুপ। বিওএ কমিটি নির্বাচিত হয়েছিল গত নভেম্বরে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এই ভাঙন। যে কমিটি চার বছরের ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছিল, এক বছরও তাকে স্থির থাকতে দেওয়া হলো না। হঠাৎ একসঙ্গে এতগুলো নীরব পদত্যাগ স্বেচ্ছার, নাকি চাপের?

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানতে চাইলে আপনি নিশ্চিত মনে চাপের আগে টিক চিহ্ন বসিয়ে দিন।

ফেডারেশনগুলোর শীর্ষ কর্তারা এখন এমন এক অস্বস্তিতে আছেন, যেখানে মুখ খোলা মানে ঝুঁকি, আর চুপ থাকা মানে নিরাপদ থাকা। যারা পদত্যাগ করেছেন তাদের অনেককে সামনের সময়ের জন্য একটা লোভনীয় পদের মুলো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর যারা করেননি তাদের ক্রীড়াঙ্গন থেকে সরে যাওয়ার মতো হুমকিও দিয়েছেন ‘জনাব ফোনকর্তা’।

বিসিবির চেনা চিত্রনাট্য

ক্রীড়াঙ্গনের আড্ডায় এখন একটাই আলোচনা। বিসিবিতে যা ঘটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি কি হতে চলেছে অলিম্পিকে? সেখানে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কমিটি থেকে সদস্যরা একে একে সরে যাওয়ার পর গঠিত হয়েছিল অ্যাডহক কমিটি। প্রথমে আসে কয়েকটি পদত্যাগ, তারপর কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, শেষে নতুন ব্যবস্থা। চিত্রনাট্যটা এতটাই চেনা যে দর্শক আগেই শেষ দৃশ্যের আন্দাজ করে ফেলেছেন। এনএসসি এই প্রশ্নে সতর্ক। তাদের ভাষ্য, পদত্যাগের বিষয়ে তারা কিছুই জানে না। যে সংস্থা কিছুই জানে না বলে দাবি করছে, তার নিজের ক্রীড়া পরিচালকের ফোনের খবরও কি তার অজানা? আর যারা স্বচ্ছতার দাবি তোলে, ফোনে পদত্যাগ আদায়ের চেষ্টা কি তাদের স্বচ্ছতার নমুনা? এশিয়ান গেমসের পদক ও ব্যর্থতার হিসাব নিয়ে যখন দেশজুড়ে কাটাছেঁড়া চলছে, তখন মূল্যায়নের কথাটা উঠল এমন এক মুহূর্তে, যখন সংস্থাটির দিকে আঙুল তোলা সবচেয়ে সহজ। বিসিবির অভিজ্ঞতা ক্রীড়াঙ্গনের কাছে নতুন নয়। বিওএ একই পথে গেলে ক্ষতিটা এক সংস্থায় থামবে না। ছড়িয়ে পড়বে প্রতিটি ফেডারেশনে, যাদের প্রতিনিধিরাই এই কাউন্সিলের ভোটার।

অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন কী করবে

এই অবস্থায় বিওএর সামনে পথ কী? সংস্থাটি তাকিয়ে আছে আসন্ন নির্বাহী সভার দিকে। চলতি মাসেই সেই সভা হওয়ার কথা। সেখানে পদত্যাগপত্রগুলো উপস্থাপন করা হবে, ঠিক হবে পরবর্তী পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সঙ্গে কথা বলেই এগোতে চায় বর্তমান কমিটি। এর বিকল্পও নেই। অলিম্পিক চার্টারের নীতি পরিষ্কার। জাতীয় অলিম্পিক কমিটিকে নিজের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে হবে, ঠেকাতে হবে রাজনৈতিক চাপ। কোনো সরকারেরও এখতিয়ার নেই এমন কমিটির ওপর কর্তৃত্ব খাটানোর। খাটাতে গেলে নেমে আসে সাসপেনশনের খড়গ। সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগে কুয়েতের অলিম্পিক কমিটি সেই শাস্তির মুখে পড়েছিল। তখন ঝুঁকিতে পড়ে ফেডারেশন, খেলোয়াড় আর আন্তর্জাতিক আসরে দেশের পতাকা। অর্থাৎ ফোনের ওপারের ক্ষমতা দেখানোর খেলায় হারতে পারে পুরো দেশের ক্রীড়া। সেই ঝুঁকির দায় কে নেবে, এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। সময় হাতে বেশি নেই, কারণ প্রতিটি নতুন চিঠি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে। সংস্থার করণীয় তাই স্পষ্ট। পদত্যাগের পেছনের প্রকৃত কারণ খোলাখুলি খতিয়ে দেখা। আর বাইরের চাপ এলে তা প্রকাশ্যে আইওসিকে জানানো। এর কোনোটিই এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।

মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানার সুর অবশ্য অন্য রকম শান্ত। তিনি জানিয়েছেন, ‘পদত্যাগ প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও অধিকার। পদত্যাগের চিঠিগুলো নির্বাহী কমিটির সভায় তোলা হবে। সেখানেই সিদ্ধান্ত হবে। তারপর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কী করণীয় সেটা জানতে চেয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) কাছে পরামর্শ চাওয়া হবে।’

পদত্যাগ অবশ্যই অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার যদি ভয়ের চাপে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা আর অধিকার থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় আত্মসমর্পণ।

ভাঙন কখনো হঠাৎ আসে না, ধীরে ধীরে জমে। বিওএর ঘরে সেই জমে ওঠা এখন চোখে পড়ার মতো। স্ক্র্যাপবুক জানাচ্ছে, গত ডিসেম্বরে নবনির্বাচিত কমিটির প্রথম সভায় বিওএ সভাপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছিলেন, ক্রীড়াঙ্গন ‘রাজনীতিমুক্ত’ হওয়া উচিত। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার স্লোগানে বিশ্বাসী। তবে কোনো এক ফোনের ভয়ে অলিম্পিকের কাউন্সিলরদের পদত্যাগের এই মিছিল, এই ভয়ের সংস্কৃতিতে ভোটের বৈধতা, ফেডারেশনের স্বাধীনতা, খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ, সংস্থার স্বায়ত্তশাসন—সবই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় এখন ফোনকর্তার, এনএসসির এবং অলিম্পিক ভবনেরও।

লিফটে এক মিনিট সময় না দেওয়া যায়, কিন্তু জেনে রাখুন—ইতিহাসের কাছে জবাব না দিয়ে পার পাওয়া যায় না!

দুই লাল কার্ডের ম্যাচে লিভারপুলের নাটকীয় জয়

হালান্ডের জোড়া গোলে সিটির জয়, রেকর্ড মারেস্কার

ছোট পর্দায় ত্রিদেশীয় ক্রিকেট সিরিজের পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার প্রথম ওয়ানডেসহ আরো ম্যাচ

বার্সার ফের গোলোৎসবের রাত

দাঁড়াতেই পারেনি বাংলাদেশ

ওমানে জয়ে শুরু যুবাদের

জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ২৭২

নেতোর জোড়া গোলে এভারটনকে হারাল চেলসি

‘নতুন সংস্করণ’-এর দ্রাবিড় ও শেবাগের আবির্ভাব

ম্যাকডোনাল্ডের ‘ঝুঁকি’ বনাম পোলকের ‘সম্ভাবনা’