আর্থিক অনিয়ম, অডিট করাতে সভাপতির অনাগ্রহ
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনুমতি না নিয়ে আর্চারি ফেডারেশনের কমিটি থেকে কোষাধ্যক্ষকে সরিয়ে দিয়েছে বর্তমান সভাপতি ড. মোখলেসুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বোর্ড। শুধু তাই নয়, কোষাধ্যক্ষ ও সাধারণ সম্পাদকের সম্মতি না নিয়ে ফেডারেশনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সিগনেটরি (স্বাক্ষরকারী) বদলে তারা উত্তোলন করেছেন প্রায় ১৪ লাখ টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে আর্চারি ফেডারেশনে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়মকানুন ছিল না। অনেক আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে।
গত বছর সরকার ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটি করে দেওয়ার পর কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পান আইবিএ থেকে এমবি ডিগ্রিধারী শহিদুজ্জামান। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক এনজিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে আর্চারি ফেডারেশনকে একটা সিস্টেমে আনার চেষ্টা করেন এই কর্মকর্তা। প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’-এই টার্মের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।
অ্যাডহক কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার সময় আর্চারি ফেডারেশনের সাড়ে সাত কোটি টাকা এফডিআর ছিল। সব ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রতা সাধন ও পরিচ্ছন্ন হিসাব-নিকাশের প্রতি জোর দেওয়ায় বছরের ব্যবধানে সেই এফডিআর প্রায় দুই কোটি টাকা বেড়েছে। কিন্তু হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে কোষাধ্যক্ষ শহিদুজ্জামানের কঠোরতা সম্ভবত পছন্দ হয়নি বর্তমান সভাপতিসহ কমিটির গুটি কয়েকজনের। ফলে বিপত্তি শুরু হয়। জানা যায়, দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে ক্রীড়া পরিষদের অ্যাডহক কমিটি নিয়োগকারী টাস্কফোর্স বলেছিল, ফেডারেশনের আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য অডিট করার কথা। রহস্যজনক কারণে অডিট করাতে রাজি হননি সভাপতি।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফেডারেশনের খরচ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার উদ্যোগ নেন পদচ্যুত কোষাধ্যক্ষ। সেখানেও সমস্যার তৈরি হয়। তির-ধনুক ইত্যাদি ক্রীড়া সরঞ্জামাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় ফেডারেশনের। রহস্যজনক কারণে বারবার একই জায়গায় কিংবা ব্যক্তির মাধ্যমে এসব কেনাকাটার কাজ করা হয়। অথচ একাধিক জায়গায় যাচাই করে এসব দামি জিনিস ক্রয় করলে খরচ কমে, ফেডারেশন লাভবান হয়। কিন্তু সেই পথে হাঁটতে চান না বর্তমান সভাপতি। খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, শুধু কেনাকাটাই নয়, ফেডারেশনের অর্থে ব্যক্তিস্বার্থও হাসিল হয়েছে।
আর্চারি ফেডারেশনের পদচ্যুত কোষাধ্যক্ষ শহিদুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, ‘আমি এত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করে যাওয়ার পরও যখন হঠাৎ করে বোর্ড সভায় আমাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়, সেটি খুবই অপমানের। এতে আমি খুবই সারপ্রাইজ হয়েছি, বলে বোঝাতে পারব না।’ কোষাধ্যক্ষকে রাতারাতি পরিবর্তন করা হয়েছে, সেই কারণ ক্রীড়া পরিষদের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ।
তার অভিযোগ, আসন্ন বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে প্রায় ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর সম্মতি দিয়েছেন আর্চারি সভাপতি। যেখানে ১৩ জন খেলোয়াড় ও ৭ জন কোচ-কর্মকর্তা আছেন। এই বিশাল বহর পাঠানো অপ্রয়োজনীয়, অর্থের অপচয় ও বিদেশ ভ্রমণ ছাড়া কিছুই নয়। এজন্য বাজেট আনুমানিক ৬৩ লাখ টাকার বেশি হতে পারে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৫ এপ্রিল বোর্ড সভায় এই মোটা অঙ্কের অর্থ কোথা থেকে জোগাড় হবে—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেন কোষাধ্যক্ষ শহিদুজ্জামান। তখন একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য খুবই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। কোষাধ্যক্ষের প্রতি রীতিমতো ক্ষুব্ধ হন।
এ ঘটনার পরপরই হঠাৎ সভাপতি শহিদুজ্জামানের উদ্দেশে বলে ওঠেন, ‘আপনার জায়গায় অন্য কাউকে দায়িত্ব সদস্য তুহিনকে দায়িত্ব দিতে চাই।’ যেই বলা সেই কাজ, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনুমতি ছাড়া বেআইনিভাবে তুহিনকে দেওয়া হয়েছে নতুন কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব। আর অপসারিত হলেন শহিদুজ্জামান।