গত কয়েক আসরে বাংলাদেশ যতবারই স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছেছে, ঠিক ততবারই সেমিফাইনালের দরজায় গিয়ে থমকে যেতে হয়েছে। সেই অধরা সেমিফাইনালের গণ্ডি পেরিয়ে এবার ফাইনালের দরজা খুলতেই মরিয়া বাংলাদেশ দল। টুর্নামেন্টের সমীকরণ নিগার সুলতানা জ্যোতির দলের জন্য বেশ সহজ ও স্পষ্ট : প্রথম ধাপে গ্রুপ পর্বের বাধা টপকানো, আর দ্বিতীয় ধাপে সেই অভিশপ্ত সেমিফাইনালের বৈতরণী পার হওয়া। আর সেটি করতে পারলেই মিলবে আট বছর আগের গৌরবময় ইতিহাস নতুন করে লেখার সুবর্ণ সুযোগ।
কখনো কখনো কোনো টুর্নামেন্টে একটি দলের সামনে অন্য কোনো দল সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় না; বরং তাদের নিজেদেরই অতীতের জমাট বাঁধা ব্যর্থতা। সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলমান এবারের নারী এশিয়া কাপের দশম আসরে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সামনেও যেন ঠিক সেই একই প্রতিপক্ষ সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যদিও গ্রুপ পর্বে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের মোকাবিলা করতে হবে এশিয়ান ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি শ্রীলঙ্কা, নবাগত ইন্দোনেশিয়া এবং স্বাগতিক সংযুক্ত আরব আমিরাতকে। অন্য গ্রুপে আবার অপেক্ষা করছে ভারত ও পাকিস্তানের মতো ক্রিকেট জায়ান্টরা। কিন্তু অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি ও তার দলের চোখ কেবল প্রতিপক্ষের পারফরম্যান্সের দিকে নয়, বরং নিজেদের পুরোনো এক অমীমাংসিত হিসাব চুকানোর দিকে।
২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে পরাশক্তি ভারতকে হারিয়ে নারী এশিয়া কাপের ঐতিহাসিক খেতাব জিতেছিল বাংলাদেশ। ছেলে কিংবা মেয়েদের ক্রিকেট মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত সেটাই সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি সাফল্য। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক অর্জনের পর সাফল্যের সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী আসরগুলোয় ফাইনালের টিকিট না মেলায় ২০১৮ সালের সেই ট্রফিটি যেমন দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা হয়ে রয়েছে, তেমনি তার পরবর্তী সময়টা আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাসে ভরা। অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি এবার ঠিক সেই আক্ষেপের জায়গাটাতেই প্রলেপ দিতে চান। তার মতে, সরাসরি শিরোপার কথা না ভেবে আপাতত মূল লক্ষ্য ফাইনালে ওঠা। কারণ সেমিফাইনালের বাধা কাটাতে পারলেই জয়ের মূল পথ উন্মুক্ত হবে।
অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি জানান, বারবার সেমিফাইনালে গিয়ে বাদ পড়ার এই ব্যর্থতার বৃত্ত এবার ভেঙে ফেলতে চান তারা। তার ভাষ্যমতে, ‘এবার আমাদের মূল লক্ষ্য ফাইনাল খেলা। কারণ আমরা সেমিফাইনাল পর্যন্ত গিয়ে বাদ পড়ে আসি, বারবার একই জিনিস হচ্ছে। তাই এবার আমরা এই বাধাটা ভাঙতে চাই। ফাইনালে উঠতে পারলে শিরোপা জয়ের সুযোগও তৈরি হবে।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতের কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে দেশে ফ্লাডলাইটের নিচে অনুশীলন ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। তাই তো নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তুষ্ট জ্যোতি। এ নিয়ে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘প্রস্তুতি অনেক ভালো হয়েছে। আন্ডার লাইট যেহেতু সবগুলো গেম ওখানে, তাই এখানে আমরা দুটি প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলেছি এই জায়গায়। প্রস্তুতির দিক থেকে আমি মনে করি খুব ভালো ছিল।’
তবে এশিয়া কাপের এই যাত্রাপথ বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি সমতল নয়। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে ঊরুর চোটে দল থেকে ছিটকে গেছেন অভিজ্ঞ বাঁহাতি পেসার ফারিহা ইসলাম তৃষ্ণা, যা দলের বোলিং আক্রমণে বড় ধাক্কা। তার স্থানে আকস্মিকভাবে ডাক পেয়েছেন ১৭ বছর বয়সি তরুণী ফারজানা ইয়াসমিন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখনো অভিষেক না হওয়া এই উদীয়মান তারকার সামনে তাই এক লাফে বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে, যারা ২০২৪ সালে ভারতকে হারিয়ে প্রথমবার এশিয়ান শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। অন্যদিকে সাতবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতও নামবে তাদের হারানো মুকুট পুনরুদ্ধারের তীব্র মিশনে। ফলে গ্রুপ পর্ব পার করে শেষ চারে পৌঁছাতে পারলে কঠিন থেকে কঠিনতর চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য।
এশিয়া কাপের পরপরই আয়োজিত হবে এশিয়ান গেমস। ২০১০ সালের রুপা এবং গতবারের ব্রোঞ্জ জয়ের পর এবার স্বর্ণপদক জয়ের মতো বড় কোনো সাফল্যের স্বপ্নে বিভোর দলটি। বিগত আসরগুলোতে রুপা ও ব্রোঞ্জ অর্জন করলেও, এবার সেই অর্জনের তালিকায় ‘সোনার পদক’ যুক্ত করতে চান অধিনায়ক জ্যোতি। তিনি বলেন, ‘পদকের জন্য যাওয়াই আমাদের প্রথম লক্ষ্য। তবে এবার আমাদের চেষ্টা থাকবে যেন সোনার পদক নিয়ে ফিরতে পারি।’
তবে তার আগে দুবাইয়ের চেনা-অচেনা মাঠেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কি তাদের আট বছরের জমে থাকা আক্ষেপ গুছিয়ে নতুন এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের সূচনা করবে, নাকি ২০১৮-এর সেই মহাকাব্যিক সাফল্য শুধুই একটি রঙিন স্মৃতি হয়ে ইতিহাসের পাতায় জমা থাকবে।
গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের ম্যাচ
৩১ আগস্ট, ইন্দোনেশিয়া, দুবাই
৬ সেপ্টেম্বর, শ্রীলঙ্কা, দুবাই
৮ সেপ্টেম্বর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাই
সব ম্যাচ শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা ৩০ মিনিটে।