জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আবুধাবিতে বাজেভাবে হেরেছে বাংলাদেশ। ব্যবধানটা বেশ বড়। এমন পরাজয়ের পর প্রশ্ন উঠেছেÑএকাদশে চারজন বিশেষজ্ঞ বোলার রেখে কি দলটি ভুল করেছে? নাকি ওয়ানডে ক্রিকেটে দীর্ঘদিনের ব্যাটিং দুর্দশাই আবারও ডুবিয়েছে বাংলাদেশকে? ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৯৯ রানে হারের পর এ দুই বিষয়ই আলোচনায়। ৫০ ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের দুর্বলতা যে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, চলতি বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চারবারের মুখোমুখি লড়াইয়ের তিনটিতেই হার তো সেটাই প্রমাণ করছে।
জিম্বাবুয়ে ম্যাচের আগে নিয়মিত ওয়ানডে অধিনায়ক লিটন কুমার দাসের ছিটকে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। ডান নিতম্বের জোড়ায় ব্যথার কারণে ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি। টসের আগে নিশ্চিত হয়, ত্রিদেশীয় সিরিজেই আর খেলা হচ্ছে না তার। অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে খেলতে পারেননি।
লিটনের জায়গায় দলে সুযোগ পাওয়া সৌম্য সরকারও ব্যাট হাতে কাজে লাগাতে পারেননি সুযোগ। তবে মিরাজের অনুপস্থিতিতে রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলামের অভিষেক না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে দল নির্বাচন নিয়েও।
আবুধাবির ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে আলিসকে খেলানো উপযুক্ত মনে না হলে বিকল্প হিসেবে ছিলেন হাসান মাহমুদ ও তানভীর ইসলাম। কিন্তু তাদের কাউকেই একাদশে রাখা হয়নি। বাংলাদেশ খেলেছে তিন পেসার তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান ও শরীফুল ইসলাম এবং লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেনকে নিয়ে। বাকি ১০ ওভার করার দায়িত্ব পড়ে খণ্ডকালীন বোলার মোসাদ্দেক হোসেন, সৌম্য সরকার ও সাইফ হাসানের ওপর।
তারা সম্মিলিতভাবে ১১ ওভারে ৬৮ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নিয়েছেন। পরিসংখ্যানের হিসাবে তাদের অবদান খারাপ নয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞ বোলার না খেলিয়ে খণ্ডকালীন বোলারদের ওপর নির্ভর করা কতটা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এমন সিদ্ধান্তে দলের রক্ষণাত্মক মানসিকতারই প্রতিফলন দেখছেন অনেকে।
ব্যাটিংয়ে সেই পুরোনো রোগ
লিটনকে ছাড়াই এর আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। সে সময় অবশ্য পাঁচজন বিশেষজ্ঞ বোলার নিয়ে মাঠে নেমেছিল দল। এবার ব্যাটিংয়ের গভীরতা বাড়াতে সাইফ হাসানকে একাদশে নেওয়া হয়েছে। ব্যাট ও বলে অবদান রাখলেও তাকে অলরাউন্ডার হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট ভিত্তি আছে কি না, সেটি আলোচনার বিষয়।
লিটনের বদলে পারভেজ হোসেনকে নেওয়ার সিদ্ধান্তও ইঙ্গিত দিচ্ছে পরের ম্যাচে ব্যাটিং শক্তি বাড়াতে চায় টিম ম্যানেজমেন্ট। তাতে নুরুল হাসানকে জায়গা হারাতে হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা যে দল নির্বাচনের হিসাবেও প্রভাব ফেলছে, সেটি স্পষ্ট।
জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৩৩.৪ ওভারে মাত্র ১৭২ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। ১০ ওভার শেষে দুই উইকেটে ৬৬ রান তুলে আশার ইঙ্গিত দিয়েছিল দল। এরপর বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে তারা। ৩৮ বলে ৪৬ রান করে তানজিদ হাসানই ছিলেন ব্যাটিংয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়া একমাত্র ব্যাটসম্যান।
মার্চে পাকিস্তান সিরিজের পর বাংলাদেশ ১০টি ওয়ানডে খেলেছে, জয় ও হার সমান পাঁচটি করে। এ সময়ে চারবার ২৩৫ রানের নিচেই অলআউট হয়েছে দল। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৪৮ রান তাড়া করতে নেমে ২২১, হারারেতে ১৪২ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ১১৬ এবং ২৪৮ রানের লক্ষ্যে ২৩৪; এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৭২।
২৭০ রানের বেশি করতে পেরেছে মাত্র দুবার, দুটিই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৮৪/৮ ও ২৭৪/৫। পাকিস্তান সিরিজেও ছিল একই দুর্বলতার চিত্র। ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে ২৪৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১১৪ রানে শেষ হয়েছিল এক ম্যাচ। পরে ২৯০/৫ করে বাংলাদেশ দেখিয়েছিল সামর্থ্য থাকলে ব্যাটিংয়ে বড় সংগ্রহও সম্ভব।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, মাত্র ২৪০ রানের বেশি লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের সবশেষ ১০ ম্যাচের আটটিতেই হার। জয় এসেছে কেবল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুবার।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরুর লক্ষ্য নিয়েই ত্রিদেশীয় সিরিজে নেমেছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রথম ম্যাচের বড় হার সেই পরিকল্পনায় ধাক্কা দিয়েছে। পরের ম্যাচেও হোঁচট খেলে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা তৈরি হবে। তাই শুধু দল নির্বাচন নয়, ওয়ানডেতে ব্যাটিংয়ের পুরোনো দুর্বলতা কাটানোও এখন বাংলাদেশের জন্য জরুরি।