বিসিবির সবশেষ বোর্ডসভার দিনে পদত্যাগ করেন চার পরিচালক। এর আগে আরো তিন বিসিবি পরিচালক ছাড়েন নিজেদের পদ। সব মিলিয়ে বিসিবি থেকে এখন পর্যন্ত সাত পরিচালক পদত্যাগ করেছেন। অদ্ভুতভাবে সবাই ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। গত শনিবার পদত্যাগের পর আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা বলেন ফাইয়াজুর রহমান মিতু। তিনি জানান বিসিবিতে থাকাকালীন কাজ করতে না পারার অভিযোগও। পদত্যাগের পর তিনি যা বলেছেন, সেসবই তুলে ধরা হলো আমার দেশ-এর পাঠকদের জন্য।
বিসিবি ঘিরে এখন বিভিন্ন ধরনের আলোচনা চলছে। এর মধ্যে হুট করে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কেন?
ফাইয়াজুর রহমান মিতু : অন্য পরিচালকরা কি ভেবে ছেড়েছেনÑএটা তো আমার সঙ্গে আলোচনা করেনি। সেটা আমি জানি না। আমার ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে মনে হয়েছে এখানে কাজ করার কোনো সুযোগ ছিল না; নেইÑতাও দেখছি না। আমি সন্তুষ্ট নই, ছিলামও না। আমি এটাই মনে করছি। বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার দীর্ঘ ৩৫-৪০ বছরের সম্পর্ক। আমার সঙ্গে কোনোদিন একটু কটু কথাও হয়নি তার। তারপরও নিজের থেকে মনে হয়েছে এখানে আমি আমার সার্ভিস দিতে পারছি না।
মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বোর্ড পরিচালকদের সঙ্গে সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সম্পর্কে চিড় ধরার কারণ কী?
ফাইয়াজুর রহমান : ২৫ জন পরিচালক থাকলেও ওয়ার্কিং ফোর্স সবাইকে নিয়ে দেওয়া যায় কি না জানি না। যেটা হচ্ছে বুলবুল ভাই কিছু কিছু লোককেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত বা কিছু লোককেন্দ্রিক কথাবার্তা বলেন। ব্যক্তি বুলবুল কিন্তু একটু অন্যরকম। প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা দক্ষতা নেইÑসেটা বলব না। সেক্ষেত্রে ধরুন তার সঙ্গে দূরত্বটা অনেকের হয়েছে বা চিড় ধরেছে, এটা ঠিক। তার কারণেই যে হয়েছে, সেটা আমি ঠিক মনে করি না।
দু-তিনজন লোককে তিনি অনেক দায়িত্ব দিয়েছেন। অনেকগুলো কাজই তাদের দিয়ে করিয়েছেন। যতটুকু মনে হয়েছে, এখানে পরিচালকদের মধ্যে হয়তো যোগ্য লোক পাননি তিনি, এটাও হতে পারে। আরো অনেকজনকে অনেক দায়িত্ব ভাগ করে দিলে মনে হয় ভালো হতো।
আপনি বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট পাঁচ-সাতজনের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। তাহলে কি বুলবুল বিসিবিতে একরকম একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছেন?
ফাইয়াজুর রহমান : আমি খুব সংক্ষিপ্ত কিছু দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলাম। আমি কি তাকে দোষ দেব, নাকি তার এ পরিস্থিতির কারণেই ‘একনায়কতন্ত্র’, তা আমি বলতে পারব না। এটা হয়তো আপনারা জানেন। তিনি যেভাবে চিন্তা করেছেন, সেভাবে ওয়ার্কিং ফোর্স তৈরি করেছেন এবং সেটা একটু লিমিটেড লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। একজনের ওপর আস্থাশীল। কেন আস্থাশীলÑএটা বোঝা একটু কঠিন। তিনি আমার ওপরও ভীষণভাবে আস্থাশীল। তারপরও অনেক কাজের ক্ষেত্রেই ব্যত্যয় হয়। এক-দুটি কমিটির ক্ষেত্রে একবার বলা হয় এ থাকবে, তারপর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ওই গণ্ডির কয়েকজনের মধ্যে দায়িত্বটা দেন। হয়তো ওই কয়েকজনের ওপর তার আস্থাটা বেশি। এটাই হয়তো কারণ হতে পারে। আপনি যাকে বিশ্বাস করবেন, তার ওপরই আস্থা রাখবেন তাই না? এটা হতে পারে। আর ‘একনায়কতন্ত্র’Ñএটা সেকমভাবে আমার দেখা হয়নি।
ডিসিপ্লিনারি কমিটির দায়িত্বে ছিলেন। সিসিডিএমের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। এ সময়ে নিজের কাজগুলো ঠিকঠাক করতে পেরেছিলেন কি?
ফাইয়াজুর রহমান : স্কোপ ছিল না। আমাকে ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে রাখা হয়েছিল, ঠিক আছে। সাইমন টোফেল ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে দুটি অবজারভেশন দিয়েছেন। ওগুলো কিন্তু আমাকে জানানো হয়নি। রিপোর্ট আমার কাছে আসতে হবে। সে রিপোর্টগুলো আমার কাছে আসেনি, আমাকে দেওয়া হয়নি। তারপর ডিসিপ্লিনারি বিষয়ে যেসব অভিযোগ আসছিল, সেগুলোর জন্য আলাদা কমপ্লেইন কমিটি করা হয়েছে। এ বিষয়ে তারাই কাজ করছেন। ওই কমপ্লেন কমিটির মেম্বার আমিও ছিলাম। তারা রিপোর্টটা যথাযথভাবে হয়তো প্রেসিডেন্টের কাছে দিচ্ছেন। এখনো পর্যন্ত ওইভাবেই চলছে। ওখানেও আমার সীমিত দায়িত্ব ছিল। আর সিসিডিএমে তো আমার কাজ ছিল না।
আপনি ডিসিপ্লিনারি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে কি নাজমুল ইসলামের বক্তব্যে সন্তুষ্ট ছিলেন? কারণ দর্শানোর চিঠিতে তিনি আসলে কি বলেছিলেন?
ফাইয়াজুর রহমান : নাজমুল ইসলামের বক্তব্য আমার কাছে আসেনি। তবে ক্রিকেটারদের দাবির পর আমাকে বলা হয়েছিল শাস্তি দেওয়া যায় কি নাÑএ ব্যাপারটি দেখতে। আমি আইনজীবী ও গঠনতন্ত্র পড়ে দেখেছি। সে সুযোগটা ছিল না। তবে কিছুদিন তাকে দপ্তরবিহীন রাখার পরামর্শ দিয়েছিলাম। সেটা তো বেশিদিন রাখতে পারেনি। পরের বোর্ডসভায় তো তাকে পুনর্বহাল করা হয়।
কিন্তু কারণ দর্শানোর নোটিসের উত্তর তো আপনার কাছে যাওয়ার কথা ছিল…
ফাইয়াজুর রহমান : নাজমুলের ওগুলো কি হয়েছে, কোথায় গিয়ে সে দিয়ে এসেছেন আমি জানি না। আমার কাছে এগুলো আসেনি। কোনো কমপ্লেইনই আমার কাছে আসেনি।
ঢাকা লিগ ঠিকভাবে হয়নি। এর ব্যর্থতার দায় কি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, নাকি সিসিডিএমের?
ফাইয়াজুর রহমান : এখন রিজাইন করে এসেছি দেখে বুলবুল ভাইয়ের ওপর দোষ চাপিয়ে কথা বলব, তা নয়। বুলবুল ভাই কিন্তু বসে থাকেন না। সারাদিন কাজ করেন। একটা সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ আইসিসি খেলেছে এই লিগ থেকে ক্রিকেটার নিয়েই। বুলবুল ভাই অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করেছেন। ক্লাব ক্রিকেট খেলছেন। ক্লাব কীভাবে চলছে, ক্লাব ক্রিকেটের অবদানটা তিনি ভালো জানেন ও বোঝেন। ক্লাবগুলা যখন বয়কট করল, খেলবে না বলল, তখন এটা (আদনান রহমান) দীপন ভাই দেখতেন। ক্লাবগুলো কেন খেলে না, তা খোঁজার তেমন কোনো চেষ্টাই হয়নি। আমাদের সিসিডিএম, বোর্ডের অন্য কেউ বা বোর্ডের প্রেসিডেন্টও নন। চেষ্টার পরও হয়তো ক্লাবগুলো খেলত না। কিন্তু আপনি তো বলতে পারতেন আই হ্যাভ ট্রাইড। আপনার দায়িত্বের কারণেও চেষ্টাটা করতে হয়। একটি দৃশ্যমান চেষ্টা করার ইফোর্ট দিতে পারত। জানি না বুলবুল ভাই হয়তো দীপন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে চেষ্টা করেছেন, হয়তো হয়নি। হয়তো তিনি চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সেটা আমরা দেখতে পারিনি। খেলাটা হতে হবে, এর জন্য আমাদের চেষ্টা বেশি জরুরি ছিল; কিন্তু সেটা হয়নি। আমি জানি না বাংলাদেশে আগে কখনো এমন হয়েছে কি-না। এটা আমার ঠিক মনে পড়ছে না।
বুলবুল আসলে যে প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিলেন, তার কতটুকু পূরণ করতে পেরেছেন?
ফাইয়াজুর রহমান : দেখুন, যারা একেবারে ডে টু ডে তার সঙ্গে কাজ করছেন, তারা এটা ভালো বলতে পারবেন। আর আমি আমার ছোট পরিধি নিয়ে কাজ করেছি, করতে চেষ্টা করেছি। বুলবুল ভাই বোধ হয় প্রথমে বলেছেন টি-টোয়েন্টি খেলতে এসেছি, তারপর তাকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার কনসেপ্টে তিনি কাজ করার চেষ্টা করেছেন। তিনিই বলতে পারবেন তিনি কতটুকু সেটিসফায়েড। একনায়কতন্ত্র মানসিকতার হলে তো তিনি একা একাই করতেন। তিনি কিন্তু গুটিকয়েক লোক নিয়েই কাজটি করেছেন।