হোম > খেলা > ফুটবল বিশ্বকাপ

মেসি কি পেলেকেও ছাড়িয়ে যাবেন

এম. এম. কায়সার

একসময় ফুটবলের সবচেয়ে বড় তর্ক ছিল— পেলে, না ম্যারাডোনা? প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই বিতর্কে বিভক্ত হয়েছে ফুটবল বিশ্ব। পেলের খেলোয়াড়ি জীবনের অর্জন ব্রাজিলের তিনটি বিশ্বকাপ আর আর্জেন্টিনার হয়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের সেই জাদুকরি ভঙ্গির একক পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে উল্লাসÑ বিশ্ব ফুটবলের এই দুই চিত্র জানাচ্ছে দুই কিংবদন্তির শ্রেষ্ঠত্বের পাল্লা কখনো পুরোপুরি একদিকে ঝোঁকেনি। কিন্তু সময়ের সবচেয়ে কঠিন বিচারক সময় নিজেই; আজ যেন সেই বিতর্কের শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে। যে অধ্যায়ের প্রতিটি পঙ্‌ক্তি তো বটেই, মোটা হরফের শিরোনামেও একটাই নাম লেখাÑ লিওনেল মেসি!

এবারের বিশ্বকাপে আমেরিকার কানসাস সিটির রাতটি কেবল একটি ম্যাচের গল্প নয়; এটি ছিল ইতিহাস তৈরির নতুন এক কালজয়ী অধ্যায়। আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। তিনটি গোলই মেসির। ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক, বিশ্বকাপে মোট ১৬ গোল, সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডে সমতা, ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নামার অনন্য কীর্তি, আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০০তম ম্যাচ— এক সন্ধ্যাতেই যেন বিশ্ব ফুটবলের অনেক কিছুকে বদলে দিয়ে মেসি জানালেন, সত্যিকার অর্থেই তিনি গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম, দি গোট!

অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, এসব অর্জনের সময় তার বয়স ৩৮। যে বয়সে অধিকাংশ কিংবদন্তি স্মৃতির পাতায় জায়গা নেন, সেই বয়সে মেসি এখনো প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ভেঙে দিচ্ছেন, ম্যাচের ভাগ্য লিখছেন, দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখছেন। তার গোল এবং খেলার ছন্দময় আনন্দে এমনকি প্রতিপক্ষও মোহিত। সামনে এসে বলছে, হ্যাঁ ভাই, তুমিই সেরাদের সেরা! মেসির খেলার স্টাইল, গোলের খিদে, জেতার জেদ, অনন্য কৌশল, সারল্য, আনন্দ-উত্তেজনাÑ এ সবকিছুই তাকে বাকিদের থেকে আলাদা করে বলছে, ইয়েস এই খেলাটার আপনিই বস্। দি বিগ বস্!

মেসির শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ট্রফির সংখ্যায় নয়। শ্রেষ্ঠত্ব তার ধারাবাহিকতায়, বিবর্তনে এবং প্রভাবে। কৈশোরের বিস্ফোরক ড্রিবলার থেকে ‘ফলস নাইন’-এর বিপ্লব, তারপর প্লেমেকার, আবার প্রয়োজনে গোলমেশিন—ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই এতগুলো রূপে সমান সফল হয়েছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে একই দক্ষতায় আধিপত্য বিস্তার করা, প্রতিটি প্রজন্মের ফুটবলকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা— এটাই মেসির অনন্যতা।

পেলে বিশ্বকাপ জিতেছেন তিনবার। ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালে একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দিয়েছিলেন। এই দুই কীর্তিই ফুটবলের চিরন্তন সম্পদ। কিন্তু মেসি এমন এক পূর্ণতা এনে দিয়েছেন, যেখানে ব্যক্তিগত প্রতিভা, দলীয় সাফল্য, দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য, রেকর্ড, নেতৃত্ব এবং নান্দনিকতা— সবকিছু একসঙ্গে মিলেছে।

২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয় তার ক্যারিয়ারের শেষ অপূর্ণতাও পূরণ করে। আর এখন ২০২৬ বিশ্বকাপেও হ্যাটট্রিক দিয়ে তিনি যেন জানিয়ে দিলেন— গল্প এখনো শেষ হয়নি। তিনি কেবল অতীতের কিংবদন্তি নন, বর্তমানেরও সেরা।

ফুটবলে অনেক মহান খেলোয়াড় এসেছেন। কেউ জিতেছেন বেশি, কেউ খেলেছেন সুন্দর, কেউ আবার বদলে দিয়েছেন খেলার সংজ্ঞা। কিন্তু মেসি সেই বিরল মানুষ, যিনি এই তিনটি গুণই এক শরীরে ধারণ করেছেন। তার পায়ে বল মানেই সম্ভাবনা, বিস্ময়, সৌন্দর্য আর অনিশ্চয়তার এক অনবদ্য মিশ্রণ। তিনি শুধু গোল করেন না, ফুটবলকে শিল্পে পরিণত করেন। মেসির পায়ে বল মানেই নির্মল আনন্দের পসরা।

তর্কটা যেখানেই শুরু হোক, ফিরে আসতে হয় পেলের কাছেই। ভিন্ন তিন দশকে তিনটি বিশ্বকাপ জেতা একমাত্র ফুটবলার তিনি— ১৯৫৮, ১৯৬২ আর ১৯৭০। সতেরো বছর বয়সে সুইডেনে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক আর ফাইনালে আরো দুই গোল করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন কিশোর পেলে। ১৯৬২-তে চোটের কারণে বেশিরভাগ ম্যাচ মিস করলেও শিরোপা ধরে রাখে তার ব্রাজিল। আর ১৯৭০-এ মেক্সিকোয় যা করেছিলেন, তাকে বলা হয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত ব্যক্তিগত পরিবেশনা— ফাইনালে ইতালিকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচে নিজে একটি গোল করে অ্যাসিস্ট করেছিলেন আরো দুই গোলে। বিশ্বকাপের কিংবদন্তি হিসেবে পেলের আসনটা আজও অটুট।

হয়তো তর্ক কখনো পুরোপুরি থামবে না। ফুটবল রোমান্টিকদের কাছে পেলে আর ম্যারাডোনা চিরকালই অমর থাকবেন। কিন্তু ইতিহাস যখন সব অর্জন, সব প্রভাব, সব সৌন্দর্য আর সব ধারাবাহিকতাকে একসঙ্গে বিচার করবে, তখন একটি নামই সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে, নামটা মনে রাখুনÑ লিওনেল মেসি।

এখন আর প্রশ্নটা ‘সর্বকালের সেরা কে?’—নয়। বরং প্রশ্নটা হবে, মেসির মতো এমন আরেকজন কবে আসবেন? আর হ্যাঁ, মেসি কিন্তু এবার বিশ্বকাপ জিততে আসেননি, বিশ্বকাপ শিরোপা অক্ষুণ্ণ রাখতে এসেছেন।

জি, বিশ্বকাপ তার জেতা হয়ে গেছে চার বছর আগেই!

উজবেকিস্তানের রূপকথা থামিয়ে দিল কলম্বিয়া

মেসিকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপে নতুন রাজা কেইন

সব তর্ক শেষ, মেসি দ্য বেস্ট!

নকআউটের পথ সহজের লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ড-বসনিয়া

আর্জেন্টিনা জানাল তারা আসছে!

শেষ মুহূর্তের গোলে পানামাকে কাঁদিয়ে ঘানার উল্লাস

‘মেসি-জাদুতে’ মোহগ্রস্ত ফুটবল

বিশ্বকাপে ইরাকের জার্সিতে পাকিস্তানের জিদান, বুটে আঁকা দু’দেশেরই পতাকা

রঙহীন রোনালদোয় পয়েন্ট হারাল পর্তুগাল, কঙ্গোর ক্যারিশমা

কালো মাস্কের আড়ালে অদম্য ফেরার গল্প