স্পেন-বেলজিয়ামের মধ্যকার ম্যাচের তখন ৮৮ মিনিট, ১-১ গোলে সমতা। নির্ধারিত সময়ের বাকি আর দুই মিনিট। এরপর যোগ করা সময় শেষেই অতিরিক্ত সময়ের লড়াই। দুদলের সমর্থকরাই দুলছেন হৃদকম্পনের তালে-তালে। হঠাৎ পাও কুবার্সির দূরপাল্লার শট, বদলি গোলরক্ষক ল্যামেন্স বল আটকে দিলেও হাতে রাখতে পারলেন না। ফিরতি বল পেয়েই চিতার গতিতে গিয়ে জাল কাঁপিয়ে দেন সুযোগসন্ধানী মিকেল মেরিনো। আর সেই গোলেই শেষ হয়ে যায় বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ স্বপ্ন।
ইয়ামাল-মেরিনোরা যখন উল্লাসে ব্যস্ত, ক্যামেরার লেন্স ঘুরে গেল ডাগআউটের দিকে। দীর্ঘদিন বেলজিয়ামের তিন কাঠি আগলে রাখা কোর্তোয়া বসে আছেন নীরবে। মুখে হতাশা, চোখে অবিশ্বাস। দীর্ঘশ্বাসের দীঘল বাতাস উড়ে বেড়ালো লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামের বিবর্ণ গালিচায়। কোর্তোয়ার জীবনে এই বাতাসের আঁচটাই বোধহয় সবচেয়ে শীতল, বেদনাবিধুর ও বিষাদগ্রস্ত!
স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম সমানে সমান লড়েছে। কোর্তোয়া একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে একটি লম্বা গোলকিক নিতে গিয়েই অনুভব করেন বাম ঊরুর কোয়াড্রিসেপসে তীব্র ব্যথা। চিকিৎসা নিয়ে আবার খেলতে শুরু করেছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব, শুধু লম্বা কিক নেওয়াটাই কঠিন হয়ে পড়ছিল।
এরপর কোচ রুডি গার্সিয়া যে সিদ্ধান্ত নিলেন তাতে হীতে বিপরীতই হলো। শতভাগ ফিট নন—এমন একজন গোলরক্ষককে রেখে ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। ৩৪ বছর বয়সি কোর্তোয়াকে তুলে মাঠে নামানো হয় তরুণ সেনে ল্যামেন্সকে। বেঞ্চে বসেই চোখ ভিজে যায় কোর্তোয়ার। তখনো তিনি জানতেন না, সামনে অপেক্ষা করছে আরো বড় যন্ত্রণা। যে যন্ত্রণা পুষতে হবে পরবর্তী চার বছর। ততদিনে কি কোর্তোয়া বেলজিয়াম দলে থাকবেন, নাকি বয়সের চোখরাঙানিতে ঠাঁই হবে ইতিহাসের পাতায়? প্রশ্ন থেকেই গেল।
তবু ম্যাচ শেষে নিজের চরিত্রের আরেকটি সুন্দর দিক দেখিয়েছেন কোর্তোয়া। শেষ বাঁশি বাজার পর সবার আগে এগিয়ে গেছেন ল্যামেন্সের কাছে। ভেঙে পড়া তরুণ গোলরক্ষককে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়েছেন। কারণ তিনি জানেন, গোলরক্ষকের ভুলের বোঝা কতটা ভারী। ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের সামনে কোর্তোয়ার ভাষ্য, ‘কোয়াড্রিসেপসে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছিলাম। তবু আমি গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম। শুধু লম্বা কিক নেওয়াটাই কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। কোচ আমাকে বদলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। দলের স্বার্থই সবার আগে।’
এরপর যা বললেন সেটা দীর্ঘশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে বেলজিয়াম সমর্থকদের হৃদয়ে, ‘হয়তো এটাই বেলজিয়ামের হয়ে আমার শেষ ম্যাচ ছিল।’ এরপরই জানিয়েছেন, তিনি জাতীয় দল থেকে এক বছরের বিরতি নিতে চান। তার ইচ্ছা, নেশন্স লিগ না খেলে ইউরো বাছাইপর্বের আগে ফিরে আসা। তবে সেটি বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন মেনে নেবে কি না, তা তাদের সিদ্ধান্ত। যদি তারা রাজি না হয়, তাহলে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটিই হয়তো তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়ে থাকবে।
এই কথাগুলো যেন এক যুগের সমাপ্তির ইঙ্গিত। বিশ্বকাপের আগে থেকেই কোর্তোয়া ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এটি সম্ভবত তার শেষ বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। গত কয়েক বছরে চোট-আঘাত বেড়ে যাওয়া, ক্লাব ও জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচি—সব মিলিয়ে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলেন। এমনকি বিশ্বকাপ শুরুর আগেও বলেছিলেন, এই টুর্নামেন্টের পর জাতীয় দল ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। শেষ প্রহরের গল্পে সেদিকেই বোধহয় পা বাড়ালেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক।
সংখ্যার হিসাবে কোর্তোয়ার ক্যারিয়ার অসাধারণ। ২০১১ সালে অভিষেকের পর ১১৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ২০১৮ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামকে তৃতীয় স্থান এনে দেওয়া, সেই আসরে গোল্ডেন গ্লাভস জয়—সবই তার ঝুলিতে। কিন্তু বিশ্বকাপ কিংবা ইউরোর ট্রফি কখনো স্পর্শ করা হয়নি। তবু ফুটবলের সেরা গোলকিপারদের একজন হয়েই থাকছেন কোর্তোয়া।
ফুটবল খুব অদ্ভুত। একজন গোলরক্ষক পুরো ম্যাচে ১০টি অবিশ্বাস্য সেভ করলেও মানুষ মনে রাখে শেষের একটি গোল। কোর্তোয়ার গল্পটি তেমন হলেও ভিন্ন। গল্পটি একজন কিংবদন্তির, যিনি ইনজুরি নিয়েও মাঠে থাকতে চেয়েছেন শেষ পর্যন্ত, বেঞ্চে বসে ভাঙতে দেখেছেন স্বপ্ন, ম্যাচ শেষে সান্ত্বনা দিয়েছেন সেই সতীর্থকে, যার ভুলে বিষাদ নেমে এসেছে বেলজিয়ামের আকাশজুড়ে। ফুটবলে ‘সত্যিকারের কিংবদন্তি’ টার্মটা বোধ হয় কোর্তোয়ার জন্যই। সব কিংবদন্তির হাতে ট্রফি থাকে না। এক জোড়া গ্লাভস হাতেও কেউ কেউ হয়ে ওঠেন ইতিহাস, কোর্তোয়া যেমন।