হোম > খেলা > ফুটবল বিশ্বকাপ

আজতেকার গালিচায় ‘মেমোর শেষ প্রহর’

আরিফুল হক বিজয়

ম্যাচ শেষ। মেক্সিকো জিতে গেছে। তিনি চলে গেলেন গোলপোস্টের আরও কাছে। আলতো করে চুমু খেলেন। যেন বহু বছরের এক বিশ্বস্ত সঙ্গীকে শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছেন। গর্জে উঠল গ্যালারি, প্রতিটি কোণ থেকে ধেয়ে আসছে চিরচেনা সেই অমর ধ্বনি, ‘ওচোয়া! ওচোয়া! ওচোয়া!’। ওচোয়া হাসছিলেন, খানিক দমে গেলেন, ভেঙে গেল বাষ্পরুদ্ধ সমুদ্রের বাঁধ। গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। হাত উঠল গ্যালারির পানে। বিদায়ী অভিবাদনের শেষ জবাব দিচ্ছেন মেক্সিকোর ‘মেমো’। যে অভিবাদনে জ্বলজ্বল করছে দুই দশকেরও বেশি সময়ের স্মৃতি, সংগ্রাম, ভালোবাসা আর অনন্ত দায়বদ্ধতার গল্প। মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠায় স্বাক্ষর করে দিলেন গিয়ের্মো ওচোয়া। যাকে ভক্ত-সমর্থকেরা ‘মেমো ওচোয়া’ বলেও জানেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়। স্কোরলাইন বলবে এটি ছিল আরেকটি সাধারণ ম্যাচ। কিন্তু আজতেকা স্টেডিয়ামের ৮০ হাজারেরও বেশি দর্শক জানতেন, এটি কেবল একটি ম্যাচ নয়—এটি ছিল এক যুগের অবসান। ম্যাচের আগের দিনই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, বিশ্বকাপ শেষে অবসর নিচ্ছেন মেক্সিকোর কিংবদন্তি গোলরক্ষক। অনেক আগেই তিনি বলে রেখেছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে তার শেষ নৃত্য। ফিফার ‘লেটারস দ্যাট ইউনাইট’ অনুষ্ঠানে কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘মেক্সিকো জাতীয় দলই ছিল আমার জীবনের কম্পাস। এটি আমাকে পথ দেখিয়েছে, আমাকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে।’

২০০৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে এল ত্রির জার্সি যেন তার দ্বিতীয় চামড়া হয়ে গিয়েছিল। অসংখ্য প্রজন্ম বদলেছে, কোচ বদলেছে, সতীর্থ বদলেছে, কিন্তু গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কোঁকড়ানো চুলের মানুষটি যেন একই রয়ে গেছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র তিনজন ফুটবলার ছয়টি আলাদা বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন—লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং গিয়ের্মো ওচোয়া।

তবে ওচোয়ার গল্প অন্যরকম।

২০০৬ সালে জার্মানিতে তিনি ছিলেন তৃতীয় তরুণ গোলরক্ষক। ২০১০ সালে বিশ্বকাপের আগে হঠাৎ এক ভুল তাকে একাদশের বাইরে ঠেলে দেয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, বিশ্বকাপে তার স্বপ্ন হয়তো আর পূরণ হবে না। কিন্তু নিয়তি তার জন্য অন্য গল্প লিখে রেখেছিল। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে জন্ম নেয় এক কিংবদন্তি। ফোর্তালেজার সেই বিকেলে স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে ওচোয়া যেন মানুষ নন, এক অদম্য প্রাচীর। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি আটকে দেন নেইমারদের। গোলশূন্য ড্রয়ের সেই ম্যাচ আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলকিপিং প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচিত হয়। সেদিনই বিশ্বের কাছে জন্ম নেয় ‘মেমো’ ওচোয়ার কিংবদন্তি রূপকথা।

২০১৮ সালে রাশিয়ায় আবারও তিনি নায়ক। তার অনবদ্য পারফরম্যান্সে জার্মানিকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয় মেক্সিকো। ২০২২ সালে কাতারে মেক্সিকোর যাত্রা হতাশাজনক হলেও রবার্ট লেভানডভস্কির পেনাল্টি ঠেকিয়ে আরেকবার নিজের অমরত্বের প্রমাণ দেন ওচোয়া। তিনি গোলপোস্টের নিচে এলেই স্ট্রাইকার কিংবা ফরোয়ার্ডরা যেন দেখতেন ঝাকড়া চুলের এক মাকড়সাকে। যিনি তিন কাঠির পুরোটাই আচ্ছাদিত করে রেখেছেন আপন বুননে।

ক্লাব ফুটবলে তার ক্যারিয়ার কখনোই খুব জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। ইউরোপে তিনবার অবনমন দেখেছেন, হাজারের বেশি গোল হজম করেছেন। কিন্তু জাতীয় দলের ডাকে কখনো ক্লান্ত হননি। সমালোচনা এসেছে, বয়স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অবসরের দাবি উঠেছে অসংখ্যবার। তবুও তিনি ছিলেন। কারণ মেক্সিকোর গোলপোস্ট পাহারা দেওয়াই যেন ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘জাতীয় দল ছাড়া আমার ক্যারিয়ারকে কল্পনাই করতে পারি না। এখন যখন জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হচ্ছে, তখন ফুটবলে আর কোনো অর্থ খুঁজে পাই না।’

আর তাই হয়তো বিদায়ের জন্য এর চেয়ে সুন্দর মঞ্চ আর হতে পারত না। আজতেকা স্টেডিয়াম—যেখানে ২০০৪ সালে ১৮ বছর বয়সী এক কিশোর হিসেবে পেশাদার ফুটবলে প্রথম পা রেখেছিলেন তিনি। ২২ বছর ৪ মাস ১০ দিন পর সেই একই মাঠে শেষবারের মতো নামলেন তিনি।

চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ম্যাচের ৭৮তম মিনিটে যখন কোচ হাভিয়ের আগিরে তাকে মাঠে নামার সংকেত দিলেন, তখন পুরো আজতেকা যেন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো। গর্জন, করতালি, অশ্রু আর ভালোবাসার ঢেউয়ে ডুবে গেল স্টেডিয়াম। প্রতিবার বল তার পায়ে এলেই গ্যালারি গেয়ে উঠেছে, ‘ওলে, ওলে, ওলে... মেমো... মেমো...’

শেষ বাঁশি বাজতেই তিনি সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটলেন আজতেকার সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে। সেই পথচলায় ছিল শৈশব, স্বপ্ন, ব্যর্থতা, পুনর্জন্ম, গৌরব আর এক অনন্য ভালোবাসার ইতিহাস। মেক্সিকোর জার্সি গায়ে, বিশ্বকাপের মঞ্চে, নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্টেডিয়ামে; এর চেয়ে নিখুঁত বিদায় আর হয় না। একজন গোলরক্ষকের ক্যারিয়ার শেষ হলো। কিন্তু গিয়ের্মো ওচোয়া নামের কিংবদন্তি রয়ে গেলেন আজতেকার গ্যালারিতে, মেক্সিকোর প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে, আর বিশ্বকাপের অমর লোকগাথার পাতায়।

কিংবদন্তিরা মাঠ ছাড়েন, কিন্তু ফুটবল কখনও তাদের বিদায় জানাতে পারে না। এ এক অমোঘ সত্য।

গোলশূন্য ড্র করেও নকআউটে অস্ট্রেলিয়া, অপেক্ষায় প্যারাগুয়ে

টিকে থাকার লড়াইয়ে সেনেগাল-ইরাক

নকআউটের টিকিটের লড়াইয়ে মিসর-ইরান

গ্রুপসেরা হয়ে নকআউটে নেদারল্যান্ডস, প্রতিপক্ষ মরক্কো

ভিনি দ্য জিনিয়াস!

পয়েন্ট ভাগাভাগিতে নকআউটে জাপান-সুইডেন

ইতিহাস গড়ে প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউটে আইভরি কোস্ট

জার্মানিকে হারিয়ে ২০ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটে ইকুয়েডর

‘বিশ্বাস ছিল আমি জ্বলে উঠব’

কাতারের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে অপেক্ষায় বসনিয়া