বিশ্বকাপে ফুটবলপ্রেমীরা একের পর এক রোমাঞ্চকর ম্যাচ উপভোগ করছেন। তবে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ও রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে পাদপ্রদীপের আলো কেড়ে নিয়েছেন গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) ৩১ বছর বয়সি গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি। আটলান্টার স্টেডিয়ামে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন গোলবারের এই অতন্দ্র প্রহরী। যদিও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ইংল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে। কিন্তু ম্যাচজুড়ে ফুটবলবিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছে এমপাসির অতিমানবীয় পারফরম্যান্স।
প্যারিসের শহরতলি থেকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে উঠে আসার এই গল্পটি মোটেও সহজ ছিল না। ১৯৯৪ সালের ১ আগস্ট ফ্রান্সে কঙ্গোলিজ দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া এমপাসির ক্যারিয়ার শুরু হয় পিএসজি ও তুলুসের একাডেমি দিয়ে। এরপর রদেইজ ক্লাবে যোগ দিয়ে নিজেকে চেনাতে শুরু করেন। সেখানে ১৩০টিরও বেশি ম্যাচ খেলে দলকে লিগ ২-এ তুলতে সাহায্য করেন। একজন গোলরক্ষক হয়েও ২০২৪ সালে লরিয়েন্তের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করে দলকে সমতায় ফিরিয়ে অনন্য এক নজির গড়েন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে ফরাসি শীর্ষ লিগ ‘লিগ ওয়ান’-এর দল ল্য হাভরে-তে যোগ দিয়ে নিজের জাত চেনান।
ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেললেও, এমপাসি ২০২২ সালে নিজের পিতৃভূমি ডিআর কঙ্গোর হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক ঘটান। তবে তার আসল উত্থান ২০২৩ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে। সেখানে প্রতিটি ম্যাচে অসাধারণ খেলে দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান। বিশেষ করে, মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টি শটটি নিজেই জালে জড়িয়ে কঙ্গোর ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে যান।
২০২৬ বিশ্বকাপে কঙ্গো দল দীর্ঘ ৫২ বছর পর (১৯৭৪ সালের পর প্রথম) খেলতে আসে। গ্রুপ পর্বে পর্তুগালকে ১-১ গোলে আটকে দেওয়া, কলম্বিয়ার বিপক্ষে হারলেও এমপাসির একার ৮টি চমৎকার সেভ এবং উজবেকিস্তানকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে কঙ্গো নকআউটে পা রাখে।
বুধবার রাতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে ব্রায়ান সিপেঙ্গার গোলে কঙ্গো দ্রুত লিড নিলে পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় এমপাসির দেয়াল হয়ে ওঠার পালা। জুড বেলিংহামের বুলেট গতির শট ও হেড এবং হ্যারি কেইনের একের পর এক আক্রমণ যেভাবে তিনি রুখে দিয়েছেন, তা ছিল চোখে পড়ার মতো। দারুণ পাঁচটি সেভের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকরা তাকে ‘অ্যাবসোলিউট ব্রিক ওয়াল’ বা ‘আস্ত এক ইটের দেয়াল’ বলে প্রশংসায় ভাসান।
ম্যাচের শেষ দিকে হ্যারি কেইনের জোড়া গোলে ইংল্যান্ড কষ্টার্জিত জয় পেলেও, এমপাসির বীরত্বগাথা সবার হৃদয়ে দাগ কেটে গেছে। ম্যাচ শেষে ক্রীড়া মাধ্যমগুলো তার পজিশনিং ও ঠান্ডা মাথার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে। ইংল্যান্ড শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তবে কঙ্গোর এই বিশ্বকাপ মিশন এবং গোলপোস্টের নিচে লিওনেল এমপাসির অকুতোভয় লড়াই ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।