জাপান বনাম তিউনিসিয়ার মধ্যকার ম্যাচের প্রথমার্ধের দশম মিনিটের খেলা চলছে। কর্নার কিক থেকে আসা বলে জোরালো শট নেন জাপানি ডিফেন্ডার তাকেহিরো তোমিয়াসু। সেই শট তিউনিসিয়ার একজন খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে জালের দিকে এগিয়ে গেলেও তিউনিসিয়ার গোলরক্ষক আয়মেন দাহমেন গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন। জাপান গোল দাবি করলেও গোললাইন প্রযুক্তির সাহায্যে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বলটি মাত্র এক মিলিমিটার ব্যবধানের জন্য পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেনি, যার ফলে গোলটি বাতিল করা হয়।
ম্যাচের পর এ ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। অনেক দর্শকের কাছেই বিষয়টি বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—বল যদি গোললাইন ছুঁয়েই থাকে, তাহলে গোল বাতিল হলো কেন? আর এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দ্বারস্থ হতে হবে ফুটবল আইনের। ফুটবলের আইন বলছে, বলের পুরো অংশ গোললাইন অতিক্রম না করলে সেটিকে গোল ধরা হবে না। অর্থাৎ, বলের সামান্য অংশও যদি লাইনের সাদা দাগের ওপর বা লাইনের সামনে থাকে, তাহলে গোল নয়; বলের সম্পূর্ণ পরিধিকে লাইন পার হতে হবে। এ কারণেই জাপানের ওই প্রচেষ্টা গোললাইনের সিকিভাগ ছুঁয়ে গেলেও গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।
ম্যাচের পর বিভিন্ন বিশ্লেষক ও সাবেক ফুটবলারদের ভাষ্য, আধুনিক ফুটবলে গোললাইন প্রযুক্তি এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) সিদ্ধান্ত মানুষের চোখের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল। টেলিভিশনের কিছু অ্যাঙ্গেলে বল গোল হয়েছে বলে মনে হলেও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায় পুরো বল গোললাইন অতিক্রম করেনি। ফলে রেফারির সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত আবেগের জায়গা থেকে বিতর্ক তৈরি করলেও আইনের দৃষ্টিতে এটি একেবারেই স্পষ্ট। গোললাইন প্রযুক্তির কাজই হলো বলের অবস্থান মিলিমিটার পর্যায়ে নির্ধারণ করা, যাতে কোনো দল অন্যায্য সুবিধা বা ক্ষতির শিকার না হয়। তাই জাপানের দাপুটে ৪-০ জয়ের ম্যাচে গোলটি শেষ পর্যন্ত ফলাফলে প্রভাব না ফেললেও ঘটনাটি আবারও ফুটবলের সূক্ষ্ম প্রযুক্তিগত নিয়মগুলো সামনে এনে দিয়েছে।
অবশ্য এ ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০২২ বিশ্বকাপেও একই ঘটনা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সে ম্যাচেও জাপান ছিল, প্রতিপক্ষ স্পেন। ম্যাচের ৫১তম মিনিটে জাপানের উইঙ্গার কাওরু মিতোমা বলটি গোললাইন ছুঁয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে ক্রস করেন, আর সেই ক্রস থেকে গোল করেন আও তানাকা। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল বলটি সম্পূর্ণভাবে গোললাইন অতিক্রম করে মাঠের বাইরে চলে গিয়েছিল। কিন্তু ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায়, বলটি স্পেনের বাই-লাইন পেরিয়ে গেছে বলে মনে হওয়া অবস্থায় ক্রস করেন মিতোমা। প্রথমে অনেকেই মনে করেছিলেন বল মাঠের বাইরে চলে গিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ভিএআর পর্যালোচনার পর গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়।
পরে ফিফা ব্যাখ্যা দেয়, বিভিন্ন ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল বিভ্রান্তিকর মনে হলেও প্রযুক্তিগত প্রমাণে দেখা গেছে বলের পুরো অংশ লাইন অতিক্রম করেনি। বলের সামান্য অংশ লাইনের ওপর ছিল। তাই সেটি খেলার মধ্যেই ছিল এবং গোলটি বৈধ ছিল। জার্মান সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বলটি মাত্র প্রায় ১.৮৮ মিলিমিটার লাইনের ওপর ছিল। সে সিদ্ধান্তের কারণেই জাপান ম্যাচটি জেতে এবং জার্মানি গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
অর্থাৎ, ২০২২ সালে বল পুরোপুরি মাঠের গোললাইন পার না হওয়ায় সেই ক্রসে জাপানের গোল বৈধ হয়েছিল, আর ২০২৬ সালেও বল পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম না করায় জাপানের প্রচেষ্টা গোল হিসেবে গণ্য হয়নি। দুই ঘটনাতেই মূল বিষয় একটাই—ফুটবলের আইনে ‘পুরো বল’ লাইন অতিক্রম করেছে কি না, সেটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।