ফুটবলে কিছু ম্যাচ হয়, যা শুধু মাত্র ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি রূপ নেয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্মান রক্ষার ফুটবল দর্শনের মহাকাব্যিক এক যুদ্ধে। আর যখন লড়াইটা হয় পর্তুগাল আর স্পেনের মধ্যে, সেটি শুধু একটি ম্যাচই হয় না, সেটি রূপ নেয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’তে। আইবেরিয়ান উপদ্বীপের দুই প্রতিবেশী দেশ পর্তুগাল ও স্পেন। ফুটবলে এ দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ একে অপরের মুখোমুখি হলেই তাকে ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’ বলা হয়। ১৯২১ সাল থেকে এই ডার্বি হয়ে আসছে। দুদলের লড়াইকে ‘ইউরোপিয়ান এল ক্লাসিকো’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। এমন রোমাঞ্চকর ম্যাচেই আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল ও স্পেন। এর আগে বিশ্বমঞ্চে এ দুদলের প্রথম দ্বৈরথ দেখা যায় ২০১০ বিশ্বকাপে। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচে স্পেন ১-০ গোলে হারায় পর্তুগালকে। তবে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে দুদলের গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি ফুটবলে অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃত। ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটিতে রোনালদোর হ্যাটট্রিক আর স্প্যানিশদের টিকিটাকা ফুটবলের দুর্দান্তে এক প্রদর্শনী দেখেছিল বিশ্ব। এবারও আরেকটি হাইভোল্টেজ ম্যাচের অপেক্ষা।
এবারই শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তবে শেষের ছবি মনের মতো করে আঁকতে পারছেন না এই ফুটবল মহাতারকা। এক ম্যাচে জোড়া গোল আর অন্য ম্যাচে গোল পেলেও বিশ্বকাপে সেই দুর্দান্ত রোনালদোকে দেখা যাচ্ছে না। বয়সের ভারে তার পারফরম্যান্সে যেভাবে ভাটার টান, একইভাবে পর্তুগাল দলটিও ধারাবাহিক নয়। কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই রাউন্ড অব সিক্সটিনে এসেছে তারা। শেষ বত্রিশের ম্যাচে রামোসের শেষদিকের গোল না পেলে হয়তো অন্য দৃশ্যও দেখা যেত। ওই ম্যাচে ৮০ মিনিটে রোনালদোকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ মার্টিনেজ। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মহানাটকীয় ম্যাচ জিতলেও স্পেনের সামনে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে রোনালদোর পর্তুগাল, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সেট পিস ও কাউন্টার অ্যাটাকে বিপজ্জনক পর্তুগাল। মাঝেমধ্যে ডিফেন্স লাইনে মনোযোগ হারিয়ে ফেলাটাই তাদের চিন্তার কারণ। যদি তাদের ডিফেন্সে ফাঁকফোকর খুঁজে পায় স্পেন, তাহলে খেসারত দিতে হতে পারে লুইস ফিগো-ইউসেবিওর উত্তরসূরিদের। তবে আগের ম্যাচে পুরো ম্যাচ না খেললেও স্প্যানিশদের বিপক্ষে প্রথম একাদশেই থাকছেন রোনালদো। ৪-২-৩-১ ফরমেশনেই দল একাদশ সাজাতে পারেন পর্তুগাল কোচ মার্টিনেজ।
অপরদিকে গ্রুপ পর্ব ও নকআউট মিলে চার ম্যাচ খেলে অপরাজিত স্পেন। কোনো ম্যাচেই গোল হজম করেনি দলটি। তারা বেশ ধারাবাহিক। গ্রুপ পর্বে সেরা দল হওয়ার পর নকআউটেও দারুণ জয় পেয়েছে তারা। অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে রাউন্ড অব সিক্সটিনে উঠেছে স্প্যানিশরা। তবে পরবর্তী পর্বে উঠতে হলে পর্তুগালের বাধা পেরোতে হবে তাদের। এখানেই স্পেনের বড় পরীক্ষা হবে। তবে চিরাচরিত পাসিং ফুটবলের পাশাপাশি এবার উইংয়ে গতি যোগ করে দলটি। তরুণ তুর্কিদের পায়ে বল মানেই প্রতিপক্ষ রক্ষণদুর্গে ভয় ধরিয়ে দেওয়া। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলার যে কৌশল স্প্যানিশদের, সেটি দারুণভাবে কাজ করছে। পর্তুগাল ম্যাচে লামিনে ইয়ামাল স্পেনকে এগিয়ে দিতে পারেন। মাঠের লড়াইয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছেন এই তরুণ তুর্কি। তাছাড়া মিকেল ওয়ারজাবাল ও পেদ্রো পোরো ম্যাচে বেশ প্রভাব ফেলছেন। পর্তুগালের বিপক্ষেও তাদের জ্বলে ওঠাটাই হবে স্বাভাবিক। তবে স্পেনের দুর্বলতার জায়গা হলো স্ট্রাইকিং জোন। অতিমাত্রায় পাসিং ফুটবল খেলে ফাইনাল থার্ডে গিয়ে খেই ফেলে দলটি। তাতে গোল করার সুযোগ হাতছাড়া হয়। যদি স্পেনের মাঝমাঠের সাপ্লাই লাইনে ঠিকভাবে বাধা দিতে পারে পর্তুগাল, তাহলে গোল পাওয়া কঠিন হবে স্পেনের জন্য।
এ পর্যন্ত সব প্রতিযোগিতা মিলে মোট ৪১ বার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে পর্তুগাল ও স্পেন। এর মধ্যে ১৭ ম্যাচ জিতেছে স্পেন। আর পর্তুগালের জয় ছয়টি। বাকি ১৮ ম্যাচ ড্র হয়েছে।