‘ফুটবল আপনাকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শেখায়’—চিরন্তন এ সত্যই যেন আবার জীবন্ত হয়ে ফিরল মিয়ামির বিশ্বকাপের রাতে!
৬৭ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচের স্কোরলাইন আর্জেন্টিনা ০, মিসর ২। জি, আপনি ভুল পড়ছেন না!
বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা তখন প্রায় অচেনা, বিধ্বস্ত, মুখ শুকনো, দুশ্চিন্তায় কাহিল। আর মিসর? তারা যেন ইতিহাসের দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছিল। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে সত্যিকার নিষ্ঠুরতার ধারালো ছুরি! শেষ ১৩ মিনিটে আর্জেন্টিনা বাকি ম্যাচটি দুই ধার চাকু দিয়ে এমনভাবে চিরল যে, এই রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা সম্ভবত আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে মিসরকে!
লড়াই জেতার জেদে পুরো আর্জেন্টিনা এমন এক মহাকাব্য লিখল, যার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ছিল লিওনেল মেসির ছায়া, সরব উপস্থিতি, লিডারশিপ-যাকে বলে লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট। সে সাহসেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন এবং মিসরের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস। অথচ এ দলটিই ম্যাচের বেশিরভাগ সময় পর্যন্ত আনন্দের রেশে আপ্লুত ছিল।
ওই যে শুরুতে বলা সে কথাটা মনে পড়ছে-শেষ বাঁশি পর্যন্ত বিশ্বাস ও সাহস ধরে রাখা। মাত্র ১৩ মিনিটের তিন গোলে এই ম্যাচের সবকিছুই এক লহমায় বদলে গেল। বদলে গেল জয়ী দলের নামও!
ম্যাচ আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে জিতেছে। কিন্তু এক ঝটিকায় এ তিন গোলের গল্পে লুকিয়ে আছে আরো বড় গল্প—একটি প্রায় নিখুঁত কৌশলের, একটি মিস পেনাল্টি শটের, একটি বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তের সঠিক ব্যাখ্যার এবং একজন কিংবদন্তির সময়কে নিজ ইচ্ছেমতো আবার নিজের দিকে বাঁকিয়ে দেওয়ার গল্প। এক ম্যাচে এক সঙ্গে এত গল্পের সমাহার কে কবে দেখেছিল?
বিশ্বকাপ ইতিহাসে অনেক ক্ল্যাসিক আছে। অনেক প্রত্যাবর্তন আছে। অনেক ট্র্যাজেডিও আছে; কিন্তু এক ম্যাচে এত নাটক, এত সৌন্দর্য, এত নিষ্ঠুরতা, এত বীরত্ব, এত নায়ক, এত পার্শ্বনায়ক-সব একসঙ্গে খুব কমই দেখা গেছে। এ রাত তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি ফুটবলের নিজস্ব নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হওয়া এক মহাকাব্য।
আর এই ক্ল্যাসিক ম্যাচে মিসরের শুরুর পরিকল্পনা ছিল সাহসী, উদ্যমী ও দুরন্ত! তারা শুধু রক্ষণে দেয়াল তুলে বসে থাকেনি; বরং মাঝমাঠকে এমনভাবে সংকুচিত করেছিল যে, এনজো ফার্নান্দেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এমনকি মেসিকেও বারবার নিচে নেমে বল সংগ্রহ করতে হয়েছে। আর্জেন্টিনা বলের দখল রেখেছিল; কিন্তু সেই দখল বেশিরভাগ সময়ই ছিল নিষ্ফলা। কারণ, সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল হাফস্পেস প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল মিসর।
আক্রমণে তাদের পরিকল্পনাও ছিল অসাধারণ। মোহাম্মদ সালাহ বারবার টাচলাইন ছেড়ে ভেতরে ঢুকছিলেন। এতে আর্জেন্টিনার ফুল-ব্যাকরা দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছিলেন—সালাহকে অনুসরণ করবেন, নাকি বাইরের দৌড় সামলাবেন? সেই এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তহীনতার ফাঁকেই উঠে আসছিলেন মোস্তফা জিকো। প্রথম গোল, পরে বৈধ দ্বিতীয় গোল—দুটোই একই নকশায় আঁকা।
এর সঙ্গে যোগ হয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের অবিশ্বাস্য রাত। মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি শুধু একটি গোলই বাঁচাননি, পুরো দলকে বিশ্বাস উপহার দিয়েছিলেন। তিনি যেন প্রাচীর। মিসরের পিরামিডের দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড ফিরিয়ে দিলেন। আলভারেজের নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দিলেন হাতের পাঞ্জায়। আরেকটি শট ঠেলে দিলেন পোস্টের বাইরে। আর্জেন্টিনা যতবার আক্রমণ করেছে, ততবারই মনে হয়েছে মিসরের গোলপোস্টে গোলকিপার নয়, দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য দুর্গ। সে দুর্গের করিডোরে আর্জেন্টিনার সব আক্রমণ-বাধা পিছু হটছে।
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত অবশ্য ভিএআরের সিদ্ধান্ত। যেটা সম্ভবত শুধু ম্যাচে নয়, ম্যাচ শেষেও ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। দ্বিতীয়ার্ধে মোস্তফা জিকোর প্রথম গোলটি বাতিল হওয়ার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন; কিন্তু ফুটবলের আইন জানাচ্ছে এই গোল বাতিলের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল নেই। রিপ্লেতে দেখা যায়, আক্রমণ শুরু হওয়ার ঠিক আগে মারওয়ান আতিয়া বল দখলে থাকা লিসান্দ্রো মার্তিনেসের জার্সি টেনে তাকে বাধা দেন। এটি একই অ্যাটাকিং পজিশন ফেইজের (এপিপি) অংশ ছিল। আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) ভিএআর প্রোটোকল অনুযায়ী, গোল হওয়ার আগে একই আক্রমণের আগের বিল্ডআপে যদি ফাউল ঘটে এবং সেটি গোলের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে ভিএআর সে ঘটনায় ফিরে গিয়ে গোল বাতিল করতে পারে। অর্থাৎ, সিদ্ধান্তটি বিতর্কিত মনে হলেও আইনের দৃষ্টিতে সেটি সঠিক ছিল।
একইভাবে ম্যাচের শেষদিকে সালাহর পেনাল্টির দাবিও গ্রহণযোগ্য হয়নি। রিপ্লে স্পষ্ট বলছে, হুলিয়ান আলভারেজ প্রথমে বৈধভাবে বলে স্পর্শ করেন; এরপর দুজনের স্বাভাবিক সংঘর্ষ হয়। ফুটবলের নিয়মে এটিকে ফাউল ধরা হয় না। ফলে দুই বিতর্কেই রেফারি ও ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—দুই গোলে এগিয়ে থেকেও মিসর কেন হারল?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে ৭০ মিনিটের পরের ক্লান্তিতে। প্রথম এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে যে কমপ্যাক্ট ডিফেন্স কাঠামো মিসর ধরে রেখেছিল, সেটি বজায় রাখতে বিপুল শারীরিক শক্তি ব্যয় হয়েছে। ঠিক তখনই লিওনেল স্কালোনি মেসিকে নির্দিষ্ট অবস্থানের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দেন। তিনি কখনো ডানদিকে, কখনো মাঝখানে, কখনো আবার নিচে নেমে খেলতে শুরু করেন। একজন নির্দিষ্ট মার্কারের পক্ষে তাকে অনুসরণ করা তখন আর সম্ভব ছিল না।
ফলাফল?
মেসির অ্যাসিস্টে রোমেরোর হেডে গোল করে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেয় আর্জেন্টিনা। এরপর মেসির চোখ জুড়ানো দুর্বার গতির ভলি। দুই গোলের মাঝখানে মিসরের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ছিল মনোযোগ হারানো। বিশেষ করে সেট-পিস মার্কিংয়ে তাদের রক্ষণের শক্তি ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ইনজুরি সময়ে এনজো ফার্নান্দেসের হেডে আসে জয়সূচক গোল—যেন মানসিক জোয়ারে ভেসে যাওয়া এক ক্লান্ত প্রতিরক্ষার শেষ আত্মসমর্পণ। ইনজুরি টাইমের খেলা চলছে, সে সময় কেন ডিফেন্সে মাত্র একজন খেলোয়াড় ডি-বক্সে থাকবেন? বাকিরা কোথায়? উত্তর একটাই- ক্লান্তি। ফুটবল নিষ্ঠুরতা দেখায় যদি আপনি শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াইয়ের যথেচ্ছ শক্তি ধরে রাখতে না পারেন!
শেষ শক্তি ঢেলে দিয়ে আর্জেন্টিনা এ ম্যাচ জিতলেও তারা কিন্তু মোটেও নিখুঁত ছিল না। দলের দুই সেন্টার-ব্যাকের মধ্যকার দূরত্ব বারবার উদ্বেগের কারণ হয়েছিল। সালাহ যখন ভেতরে ঢুকছিলেন, মোস্তফা জিকো তখন সেই ফাঁকা করিডোর ব্যবহার করছিলেন। দ্বিতীয় গোলে এই দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। শক্তিশালী ও সংগঠিত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রাখতে গিয়ে মাঝেমধ্যে রক্ষণে বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি করেছে। মেসির প্রতিভা সেই ক্ষত হয়তো ঢেকে দিচ্ছে; কিন্তু প্রতিবার এমন অলৌকিক প্রত্যাবর্তন সম্ভব হবে, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইংল্যান্ড বা স্পেন-ফ্রান্স সম্ভবত আর্জেন্টিনাকে সে সুযোগ দেবে না।
আর মেসি? পেনাল্টি মিস করার পর তার চেহারাই বলে দিচ্ছিল ভুলটা কেমন ছিল। মিসর স্কোরলাইন ২-০ করার পর তার মুখ আরো শুকনো হয়ে গেল। জানতেন, এভাবে বিদায় নিলে এ বিশ্বকাপ তার বাকি সবকিছুকে ভুলে যাবে। তাই লড়াইয়ে ফিরতে চোয়াল-শক্ত পণ করলেন। খেলার কৌশল বদলালেন। আক্রমণের পথও বদল করলেন। নিজের পরিচিত সেই ছকে রইলেন না। জেতার জেদের সেই অবিশ্বাস্য শক্তিতে মেসি শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ছন্দ, গতি, বিশ্বাস—সবকিছুর পরিচালক হয়ে উঠলেন। কর্নার থেকে একটি নিখুঁত অ্যাসিস্ট, একটি অসাধারণ ভলি, অসংখ্য সঠিক সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত পুরো দলকে বিশ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া—এটাই কিংবদন্তিদের আলাদা করে। তারা ভুল করেন; কিন্তু সেই ভুলকেই প্রত্যাবর্তনের প্রথম বাক্যেও পরিণত করেন।
মিসর ম্যাচ হেরেছে; কিন্তু তাদের পরিকল্পনা, সাহস আর লড়াই বিশ্বফুটবলের শ্রদ্ধা কুড়িয়েছে। আর আর্জেন্টিনা জিতেছে শুধু তিনটি গোলের জন্য নয়; জিতেছে কারণ তাদের দলে এখনো এমন একজন আছেন, যিনি অসম্ভবকে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কখনো ‘অসম্ভব’ মনে করেন না।
ফুটবলের অভিধানে তাই নতুন করে আরেকটি লাইন লেখা হলো—স্বপ্ন ভাঙে, কৌশল ভাঙে, শরীরও হয়তো ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে; কিন্তু বিশ্বাসের নাম যদি লিওনেল মেসি হয়, তবে শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত ‘মেসির গল্পের’ সমাপ্তি হয় না।
এ বিশ্বকাপে মেসির সেই সুন্দর গল্প এখনো ক্রমশ…!