হোম > খেলা > ফুটবল বিশ্বকাপ

‘ভোজিনহা মহাপ্রাচীরে’ অমরত্বের উপাখ্যান

আরিফুল হক বিজয়

চীনের মহাপ্রাচীরের নাম শোনেননি এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। যাযাবর দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতে নির্মাণ হওয়া বিশ্বখ্যাত এই মহাপ্রাচীর কালক্রমে জায়গা করে নিয়েছে নানান কীর্তিগাথায়, যে কীর্তিগাথার সবশেষ পাতায় যোগ হওয়া কীর্তির নাম ‘ভোজিনহার মহাপ্রাচীর’। স্পেন ও কেপ ভার্দের মধ্যকার ম্যাচটি যারা দেখেছেন, তারা এতক্ষণে জেনে গেছেন ভোজিনহার কথা। ৪০ বছর বয়সে বিশ্বকাপের মতো মহামঞ্চে নিজের অভিষেক আর সেই অভিষেকেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়াÑএ যেন বাস্তবের চেয়েও বড় কোনো কাব্য। সাও ভিসেন্তে দ্বীপ থেকে উঠে আসা জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস ওরফে ভোজিনহা সেটাই দেখালেন।

শৈশব কেটেছে কেপ ভার্দের সীমাবদ্ধ বাস্তবতায়। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীতে, মা ছিলেন কাজে ব্যস্ত। বেড়ে উঠেছেন দাদা-দাদির কাছে। সেই স্মৃতি থেকেই জন্ম নেওয়া ডাকনাম ‘ভোজিনহা’, যার অর্থ পর্তুগিজে ‘ছোট দাদি’। এ নামটাই পরে তার পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।

ফুটবলে পথচলা সহজ ছিল না। বাটুকে এফসি থেকে শুরু করে সিএস মিন্দেলেন্সে খেলা, তারপর আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া হয়ে অবশেষে পর্তুগালের চাভেসে এসে থিতু হওয়া। দীর্ঘ এ যাত্রা তাকে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছে কিন্তু বিশ্বমঞ্চের আলো তখনও ধরা দেয়নি।

স্পেনের বিপক্ষে সে আলো যেন হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। ম্যাচজুড়ে বলের দখল ছিল স্পেনের, আক্রমণের ঢেউ ছিল একের পর এক। কিন্তু ভোজিনহা ছিলেন এক অদৃশ্য দেয়াল, মানবদেহে গড়া এক প্রাচীর। পুরো ম্যাচে তিনি সাতটি নিশ্চিত গোল রক্ষা করেন, ফিরিয়ে দেন ফেরান তোরেস, পেদ্রি ও আয়মেরিক লাপোর্তের একাধিক শট। প্রতিটি সেভ যেন স্টেডিয়ামের গর্জনে নতুন প্রাণ যোগ করছিল, প্রতিটি মুহূর্তে কেপ ভার্দের স্বপ্ন টিকে থাকছিল তার হাতেই।

স্পেন পুরো ম্যাচে ২৭টি শট নেয়, যার মধ্যে সাতটি ছিল লক্ষ্যে। আর সে সাতটি শটই রুখে দেন ভোজিনহা। একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে তিনি নিজের জাল অক্ষত রাখেন এবং কেপ ভার্দেকে এনে দেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম পয়েন্ট। বিশেষ করে প্রথমার্ধের শেষ দিকে তার সেভগুলো ছিল অবিশ্বাস্য। ফেরান তোরেস, আইমেরিক লাপোর্তে এবং মিকেল ওয়ারজাবালের নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে দেন তিনি।

স্পেনের বিপক্ষে এই ম্যাচে ভোজিনহা একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছেন। স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামার সময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর ১২ দিন, যা তাকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে অভিষিক্ত ফুটবলার হিসেবে জায়গা দিয়েছে। বিশ্বকাপ অভিষেকে সবচেয়ে বেশি বয়সি খেলোয়াড়ের রেকর্ড এতদিন ছিল কানাডার সাবেক অধিনায়ক আতিবা হুটচিনসনের। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে অভিষেকের সময় তার বয়স ছিল ৩৯ বছর ২৮৮ দিন। ভোজিনহা সে রেকর্ড ভেঙেছেন।

স্পেনের মতো পরাশক্তির বিপক্ষে গোল না খেয়ে ম্যাচ শেষ করে তিনি বিশ্বকাপ অভিষেকে সবচেয়ে বেশি বয়সি গোলরক্ষক হিসেবে ক্লিন শিট রাখার কীর্তি গড়েন। বিশ্বকাপে এটিই ছিল কেপ ভার্দের প্রথম ম্যাচ আর এই ম্যাচেই স্পেনকে আটকে দিয়ে দেশের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট এনে দেন ভোজিনহা।

শেষ বাঁশির পর যখন ড্র নিশ্চিত হলো, তখনই ভেঙে পড়লেন তিনি। কেবল আনন্দের কান্না ছিল না; ছিল স্মৃতি, হারানো মানুষ আর মায়ের উপস্থিতির ব্যথাও। তিনি নিজেই বলেছিলেন, দাদা-দাদি তাকে মানুষ করেছেন কিন্তু আজ তারা নেই। মা-ও ভিসা জটিলতার কারণে স্টেডিয়ামে আসতে পারেননি। এই জয় তাই কেবল মাঠের নয়, এটি ছিল তার ব্যক্তিগত জীবনেরও এক নীরব বিজয়।

এই ম্যাচ তাকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে পরিচিত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার অনুসারী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখ থেকে মিলিয়নে পৌঁছে যায়। তবে ভোজিনহা জানেন, এ গল্প কেবল তার নয়; এটি কেপ ভার্দের মতো ছোট একটি দেশের বড় স্বপ্নের গল্প। স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা ৯৫ মিনিট তাকে ইতিহাসের পাতায় লিখে দিয়েছে অমরত্বের উপাখ্যান।

ভক্ত-সমর্থকদের আরো আনন্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মেসির

মেসির প্রশংসায় ‘ভাষাহীন’ স্কালোনি

আত্মবিশ্বাস নিয়ে কলম্বিয়ার মুখোমুখি কঙ্গো

ক্রোয়েশিয়া-পানামার টিকে থাকার লড়াই

সৌদির সঙ্গে আবার দেখা হবে? আর্জেন্টিনার নকআউট প্রতিপক্ষ নিয়ে যত সমীকরণ

এটা তাহলে গোলকিপারদেরও বিশ্বকাপ!

নকআউটের আশা বাঁচিয়ে রাখল আলজেরিয়া

অবসরের ঘোষণা থেকে বিশ্বকাপের শিখরে

পেনাল্টি মিস না হলে হয়তো জোড়া গোলও হতো না: মেসি

ইয়ামাল জানিয়ে দিলেন—আমি এসে গেছি