নাইল ডেল্টার ছোট্ট গ্রাম নাগরিগ থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল এক কিশোরের। কায়রোর পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাইক্রোবাসে ঝুলে অনুশীলনে যাওয়া সে ছেলেটি একদিন হয়ে উঠবেন লিভারপুলের ‘ইজিপশিয়ান কিং’-তা হয়তো কেউ ভাবেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু লিভারপুলই বদলায়নি, বদলে গেছেন মোহাম্মদ সালাহও।
আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের আগে লিভারপুল শহরের এক ইয়েমেনি রেস্টুরেন্টে বসে দুই মিসরীয়র তর্ক যেন সে পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। চিকিৎসক মোহাম্মদ নাগি ক্ষোভ নিয়ে বলছিলেন, ‘আমি আজীবন লিভারপুলের সমর্থক, আর তুমি শুধু মোহাম্মদ সালাহর সমর্থক।’ আহমেদ থেমে থাকেন না। তার কণ্ঠে ক্লান্তি আর ভালোবাসার মিশেল, ‘মিসরে কেউ তাকে পূজা করে, কেউ সমালোচনা করে। কিন্তু সব আলোচনার শেষে এসে দাঁড়ায় টাকা। যেন সালাহরই লিভারপুলকে টাকা দেওয়া উচিত।’
এ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে কেবল ফুটবল নেই, আছে আধুনিক ফুটবলের নির্মম বাস্তবতাও। নাগির চোখে সালাহ এখন পুঁজিবাদের প্রতীক, ‘ফুটবল দলীয় খেলা। শুধু নিজের স্বার্থে ক্লাব বা কোচের বিরুদ্ধে কথা বলা ঠিক নয়। এটা রক্তচোষা পুঁজিবাদের প্রতিচ্ছবি।’ অথচ সেদিনই ব্রাইটনের বিপক্ষে বদলি হয়ে নেমে আরেকটি ইতিহাস লিখেছিলেন সালাহ। কর্নার থেকে অ্যাসিস্ট করে প্রিমিয়ার লিগ যুগে এক ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ গোল ও অ্যাসিস্টের রেকর্ড নিজের করে নেন। অ্যানফিল্ড তখন গাইছে, ‘ইজিপশিয়ান কিং…’
তবুও সেই গানের ভেতরেও ছিল অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা। কারণ, তার আগেই সালাহ অভিযোগ তুলেছিলেন, ‘ক্লাব তাকে বাসের নিচে ফেলে দিয়েছে।’ কোচ আর্নে স্লটের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন প্রকাশ্যে। ফলে অ্যানফিল্ডে এখন একটাই প্রশ্ন- এটাই কি তবে শেষ অধ্যায়? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যেই লিভারপুল অধ্যায়ে সমাপ্তির রেখা টেনে দিয়েছেন সালাহ।
মরক্কোয় আফ্রিকা কাপ খেলতে যাওয়া সালাহকে ঘিরে বিতর্ক মাঠ ছাড়িয়ে ছুঁয়ে গেছে রাজনীতি ও পরিচয়ের জায়গায়ও। গাজায় ইসরাইলের হামলা নিয়ে তার তুলনামূলক নীরবতা মুসলিম বিশ্বের একাংশকে হতাশ করেছে। তবুও তার প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। লিভারপুলের ইমাম অ্যাডাম কেলউইকের ভাষ্য, ‘সালাহ মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী করেছে। অনেক সাদা ব্রিটিশ যুবক শুধু তার প্রভাবে মসজিদে এসেছে, কেউ কেউ ইসলামও গ্রহণ করেছে।’
একটি গবেষণা বলছে, সালাহ লিভারপুলে আসার পর ওই অঞ্চলে মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ ১৬ শতাংশ কমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কমেছে মুসলিমবিরোধী পোস্ট। অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে তার ধর্মীয় পরিচয়ও হয়ে উঠেছিল ভালোবাসার অংশ। গোলের পর সিজদায় ঝুঁকে পড়তেন সালাহ, আর গ্যালারিতে ধ্বনিত হতো ‘যদি সে তোমার জন্য যথেষ্ট ভালো হয়, তবে আমার জন্যও যথেষ্ট ভালো। সে যদি আরো কয়েকটি গোল করে, আমিও মুসলিম হয়ে যাব।’ মরক্কান ব্যবসায়ী অটো মেলুকি যেমন বলছিলেন, ‘শহরটা সালাহকে আপন করে নিয়েছে। মুসলমানদের জন্য সে গর্বের প্রতীক।’
কিন্তু জনপ্রিয়তার আলো যত বেড়েছে, ততই যেন দূরে সরে গেছেন সেই সাধারণ মিসরীয় তরুণ। আগে নিয়মিত মসজিদে যাওয়া মানুষটি এখন থাকেন শহরের বাইরে ধনীদের এলাকায়। তার চারপাশে এখন অ্যাডিডাস, পেপসি, উবার, ভোডাফোনের মতো ব্র্যান্ডের ঝলকানি। সমালোচকরা মনে করেন, করপোরেট দুনিয়া তাকে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু লিভারপুলের সাধারণ সমর্থকদের কাছে তিনি এখনো আবেগের নাম।
অ্যানফিল্ডের বাইরে দাঁড়িয়ে সমর্থক ফিল বলেন, ‘হ্যাঁ, ওর আচরণে আমরা হতাশ। কিন্তু আমরা ওকে ভালোবাসি, কারণ সে যেমন একজন মিসরীয়, মুসলিম, আরব- সবকিছু মিলিয়ে সে আমাদেরই একজন।’ ১৭ বছর বয়সি রায়ানের চোখে সালাহ কেবল একজন ফুটবলারই নন, স্বপ্নের আরেক নাম,- ‘যে দেখিয়েছে তুমি কোথা থেকে এসেছ, সেটা বড় কথা নয়। বড় স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়।’
আর হয়তো এ কারণেই সালাহকে নিয়ে ভালোবাসা আর অভিমান- দুটোই এত গভীর। কারণ, তিনি শুধু গোল করেননি; বদলে দিয়েছেন একটি শহরের সংস্কৃতি, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, ফুটবলের ভাষা। আবার ইংলিশ ফুটবলও বদলে দিয়েছে তাকে- একজন লাজুক মিসরীয় তরুণ থেকে বিশ্ববাজারের সুপারস্টারে। অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে তাই আবেগ জমে ওঠে অন্যরকমভাবে। তিনি সত্যিই চলে যাচ্ছেন। কিন্তু কিংবদন্তিরা কখনো পুরোপুরি বিদায় নেন না। তারা থেকে যান গ্যালারির গানে, সিজদার ছবিতে, অ্যানফিল্ডের লাল আলোয় আর কোটি মানুষের হৃদয়ে।