প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বছর ঘুরে ঈদ আসে। আবারও এসেছে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ; কিন্তু ঈদের বাঁকা চাঁদ সময় সময় সব জনপদে খুশির বার্তা বয়ে আনে না। কোথাও কোথাও মেঘেই ঢাকা থাকে আকাশ। তেমনই এক জনপদ ফিলিস্তিন। যেখানে এ বছরও ঈদ এসেছে দখলদারের নৃশংসতা আর বর্বরতার মধ্যে। যেখানে প্রতিদিন মানুষদের জীবন কোরবানি হয়ে যাচ্ছে আগ্রাসী শক্তির মিসাইল আর বুলেটের আঘাতে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় এখন আর কোনো পরিবার ঈদ উদযাপন করার মতো অবস্থায় নেই।
পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনি শহরগুলোয় নিয়মিত ইসরাইলি সেনাদের আগ্রাসন চললেও সর্বাত্মক যুদ্ধ সেখানে হয়নি। যে কারণে পশ্চিমতীরের অবস্থাসম্পন্ন ধনী পরিবারগুলো ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশু কোরবানি ও অন্যান্য আয়োজনের হয়তো সুযোগ পাচ্ছেন। তবে দেশের আরেক প্রান্তের মানুষ যখন ক্ষুধা আর বোমায় মারা যাচ্ছেÑতখন নিশ্চিতভাবেই তাদের ঈদের আনন্দ হয়ে যাচ্ছে ম্লান।
ঈদুল আজহার প্রধান আয়োজন হচ্ছে ঈদের নামাজ ও পশু কোরবানি করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই ফিলিস্তিনিরাও কোরবানির জন্য ঈদের কয়েক দিন আগ থেকেই পছন্দমতো পশু কিনতে শুরু করেন। কোরবানির পশু হিসেবে দেশটিতে সর্বাধিক বিক্রি হয় ভেড়া। এরপরই আছে দুম্বা, গরু, ছাগল ও উট। ফিলিস্তিনে কোরবানির উপযোগী একটি ভেড়ার গড় মূল্য ২৫০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। কয়েক শ খামারি আছেন দেশটিতে যারা কয়েক মাস আগ থেকে কোরবানির হাটের জন্য পশু প্রস্তুত করেন। এ ছাড়া মিসর, ইসরাইল, জর্ডান থেকেও পশু আমদানি করেন ব্যবসায়ীরা। ঈদের কয়েক দিন আগ থেকে মহল্লায়-মহল্লায় পশুর হাট বসে। ফিলিস্তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, এবারের যুদ্ধের আগে গাজা উপত্যকা ও পশ্চিমতীর মিলে প্রতি ঈদে দুই লাখের বেশি পশু কোরবানি করা হতো।
ঈদুল আজহায় নতুন পোশাক কেনার রীতি রয়েছে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে। পরিবারের জন্য কেনার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনকে পোশাক উপহার দেয় সচ্ছল পরিবারগুলো। বাচ্চারা কেনে নতুন খেলনা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ঈদ উপলক্ষে নতুন খেলনা নিয়ে বসে দোকানিরা। ফিলিস্তিনিরা তিন দিন ধরে ঈদুল আজহা উদযাপন করেন।
ঈদুল আজহার সকালে ফিলিস্তিনিরা গোসল শেষে নতুন পোশাক পরে সুগন্ধি লাগিয়ে ঈদগাহে যান। নামাজ শেষে হয় পশু কোরবানির পর্ব। কোরবানির পশুর গোশত তিন ভাগে ভাগ করার রীতি রয়েছে ফিলিস্তিনি সমাজে। একভাগ নিজেদের জন্য, একভাগ আত্মীয়দের (ধনী-গরিব উভয়) জন্য এবং আরেক ভাগ গরিব প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করেন তারা। বাসায় বাসায় বিভিন্ন স্বাদের খাবার তৈরি করা হয়। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে কোরবানির গোশতের বাহারি স্বাদের আইটেম। মা’মাল নামে এক ধরনের পিঠা ঈদ উৎসবে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। এ ছাড়া আরো অনেক ধরনের পিঠা তৈরি হয় বাসায় বাসায়।
তুলকারাম, নাবলুসসহ পশ্চিমতীরের অনেক শহরে এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসরাইলি বাহিনী অভিযানের নামে প্রায় নিয়মিতই আগ্রাসন চালিয়ে আসছে। বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে এ বছর। দখলদার বাহিনী বুলডোজার চালিয়ে কয়েক মাসেই কয়েক শ ফিলিস্তিনির বাড়িঘর ভেঙেছে। এসব কারণে পশ্চিমতীরের মানুষের মধ্যেও এবার কোরবানির ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান। তার ওপর গাজার পরিস্থিতিও তাদের ঈদের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।
ফিলিস্তিনের বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড গাজা উপত্যকায় এ বছরও ঈদের আনন্দ পুরোপুরি অনুপস্থিত। গাজার প্রায় শতভাগ বাসিন্দা তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন চলমান ইসরাইলি আগ্রাসনে। ঘরবাড়ি, ব্যবসায়-চাকরি সবকিছু হারিয়ে তারা এখন উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছেন। যে কারণে তাদের জন্য ঈদ উদযাপন বহু দূরের স্বপ্ন। প্রতিদিন বেঁচে থাকাই তাদের কাছে ঈদের মতো।
গত বছর কোরবানির ঈদের সময় ইনতিসার নামের এক নারী চীনা বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার রিপোর্টারকে বলেছিলেন, আপনি যদি গাজার প্রতিটি মানুষের কাছে জানতে চান তাদের উৎসবে কী প্রত্যাশাÑকোনো সন্দেহ নেই প্রত্যেকে বলবে যুদ্ধ বন্ধ হওয়া এবং নিজের বাড়ি ফেরাটাই তাদের প্রধান চাওয়া।
গত বছরের মতো এবারও গাজায় বসেনি কোনো কোরবানির পশুর হাট, দোকানে দোকানে ওঠেনি ঈদের নতুন জামা। মহল্লার মোড়ে মোড়ে বিক্রি হয়নি শিশুদের খেলনা। গত বছর গাজায় খুব অল্প কিছু পরিবারকে কোরবানি করতে দেখা গেছে। সেটিতেও ছিল না কোনো ঈদের আমেজ। কোনো মতে পশু জবাই করে ইবাদত পালন করেছেন তারা। আবার কোথাও হয়তো একটি পশু জবাই করে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেওয়া অনেকগুলো পরিবার মিলে রান্না করে খেয়েছে। তবে সেই সুযোগটাও গাজার সব বাসিন্দার কপালে জোটেনি। ইসরাইলি মিসাইল হামলায় বিধ্বস্ত মসজিদের পাশে অথবা খোলা রাস্তায় কাপড় বিছিয়ে নামাজ আদায় করেছেন গাজাবাসী।
ইসরাইল অধিকৃত নগরী জেরুজালেমের মুসলিম বাসিন্দাদের প্রধান ঈদের জামাত হয় পবিত্র আল-আকসা মসজিদে। তবে ইচ্ছা থাকলেও সেখানে ঈদের জামাতে শামিল হতে পারেননি সবাই। কারণ দখলদার ইসরাইলি সেনারা আল-আকসা মসজিদে ঢুকতে দেয় না তরুণ, যুবক ও মধ্যবয়সি পুরুষদের। শুধু নারী, শিশু, বৃদ্ধরা সেখানে নামাজ আদায় করার সুযোগ পান। ইসরাইলি পুলিশ ও সেনাদের কড়া পাহাড়ায় নামাজ আদায় করতে হয়। তারপরও মুসলিমদের প্রথম কেবলায় ঈদের জামাতে ঢল নামে মুসল্লিদের। গত বছর কোরবানির ঈদে আল-আকসার জামাতে শামিল হয়েছিল ৪০ হাজারের বেশি মুসলিম।
ঈদুল আজহার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ। সামর্থ্যবান মুসলিমদের জন্য এই ফরজ ইবাদতটি প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে পবিত্র মক্কায় গিয়ে পালন করতে হয়। বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো ফিলিস্তিনি ধনীরাও হজ পালন করেন। তবে তাদের দেশত্যাগের ক্ষেত্রে রয়েছে কড়া ইসরাইলি বিধিনিষেধ। ২০২৪ সালের কোরবানির ঈদে গাজার কোনো বাসিন্দা হজ পালন করতে যেতে পারেননি। যুদ্ধের কারণে মিসর সীমান্তের রাফাহ ক্রসিং ইসরাইলি বাহিনী দখল করে রাখায় গাজার মানুষরা গত বছর হজ করতে পারেননি। প্রতিবছর গাজা থেকে গড়ে আড়াই হাজার মুসল্লি হজ পালন করতে পবিত্র মক্কায় যান। এ বছরও তাদের হজে যাওয়া হচ্ছে না। আবার কবে গাজার মানুষ হজে যেতে পারবেন, সেটি কেউ জানে না।
পশ্চিমতীর থেকে প্রতিবছর গড়ে সাত-আট হাজার মুসল্লি হজ করতে যান। তাদের হজে যেতে হয় জর্ডান হয়ে। জর্ডান থেকে বিমান বা দীর্ঘ সড়ক পথ পাড়ি দিয়ে ফিলিস্তিনি হাজিদের মক্কায় পৌঁছাতে হয়। আর গাজার বাসিন্দাদের হজে যেতে হয় মিসর হয়ে। জেরুজালেমসহ ইসরাইল অধিকৃত ভূখণ্ডে বাস করা মুসলিমদের জর্ডান সরকারের কাছ থেকে বিশেষ পরিচয়পত্র নিয়ে জর্ডানের নাগরিক কোটায় হজ করতে হয়। কারণ ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি সৌদি আরব। যে কারণে ইসরাইলি পরিচয়ে কারো হজে যাওয়ার সুযোগ নেই।