জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) প্রধান সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, চলতি বছরের এল নিনোর প্রবাহ চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রচণ্ডতম হতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
সাওলো বলেন, এল নিনোর বর্তমান গতিপ্রবাহ সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী। চার দশক ধরে সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে এল নিনোর গতিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
তিনি বলেন, ‘ব্যতিক্রমী এই এল নিনোর বিশ্বজুড়ে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যেই এর প্রভাবে খরা ও বন্যার মতো বিপদ ও বিপর্যয় দেখছি এবং এল নিনো শক্তিশালী হওয়ার জেরে এ ধরনের প্রভাব আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছি।’
ডব্লিউএমওর পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি বছরের শেষে এল নিনোর প্রভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা ২০২৭ সালেও অব্যাহত থাকবে।
এল নিনো একটি প্রকৃতিগত অবস্থা, যার মাধমে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রের পানি প্রচণ্ড উষ্ণ হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বাতাসের চাপ ও বৃষ্টিপাতের ধারায় পরিবর্তন হয়। সাধারণত দুই থেকে সাত বছরের ব্যবধানে এল নিনো সংগঠিত হয় এবং ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়।
ডব্লিউএমও সতর্কতা জানায়, ‘সামনের মাসগুলোয় এল নিনো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আগামী মাসগুলোয় এটি প্রচণ্ডভাবে শক্তিশালী হবে। এর ফলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার প্রবাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এবং বন্যা, খরা ও চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি তৈরি হবে।’
এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিশ্বজুড়ে এল নিনোর প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্ব ‘বিরূপ আবহাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়’ প্রবেশ করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনেই এল নিনো বিশালাকার ধারণ করছে। বিজ্ঞান কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ রাখেনি। পৃথিবীর সমুদ্রভাগে বিশাল অনাবিষ্কৃত অঞ্চল রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত তার তাপমাত্রা বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বাড়ছে। লাফিয়ে লাফিয়ে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় বিশ্ব বিরূপ আবহাওয়ার এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।’
গুতেরেস বলেন, ‘এখন প্রতিযোগিতা চলছে ঝুঁকি বাড়ার এবং জলবায়ুর বিষয়ে পদক্ষেপ ও মানুষকে রক্ষায় আমাদের প্রতিজ্ঞার মধ্যে। এ প্রতিযোগিতায় আমাদের জয়ী হতে হবে।’
এল নিনোর প্রভাবে অ্যামাজন অঞ্চল, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় খরা দেখা দিয়েছে। এছাড়া ভারত ও নিরক্ষীয় অঞ্চলে বৃষ্টির গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে। ডব্লিউএমও পূর্বাভাস দিয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়া দেখা যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
এল নিনোর জেরে বিরূপ আবহাওয়ার সতর্কবার্তার মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, জুলাই-আগস্টে দাবানলের ধোঁয়ার কারণে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু রয়েছে ১২ হাজার।
সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশগুলোয় জরুরি ভিত্তিতে শত শত স্বাস্থ্যকর্মী পাঠিয়েছে দেশটি। পাশাপাশি মাস্ক ও অক্সিজেন সিলিন্ডার বিতরণ করা হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়া মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনেও পৌঁছেছে। ধোঁয়ায় বাতাসের মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোয় কুচিং, সামারাহান, সেরিয়ানসহ একাধিক এলাকার বিদ্যালয়গুলোয় সরাসরি ক্লাস স্থগিত করেছে মালয় কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে দেশজুড়ে হাঁপানি (অ্যাজমা) ও চোখের ইনফেকশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ফিলিপাইনের বাল্যাবাক অঞ্চলের বাসিন্দারা আকাশে ধোঁয়ার আস্তরণের পাশাপাশি পোড়া গন্ধ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। সেখানকার স্থানীয় চিকিৎসকরা বাসিন্দাদের চোখ চুলকানি, গলাব্যথা ও অ্যালার্জিজনিত সমস্যা বাড়ার কথা নিশ্চিত করেছেন।