হোম > বিশ্ব

বিদ্রোহীদের হাতে নিহত এক ভাই, আরেক জনকে মারল সেনাবাহিনী

ভারতের কাশ্মীরে নির্মমতা

আমার দেশ অনলাইন

এজাজ আহমেদ মুঘল তার ছোট ভাই রশিদের পরিচয়পত্র ধরে আছেন। ছবি: আল জাজিরা

২০০০ সালের জানুয়াতে হাড় কাঁপানো এক শীতের রাতে, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের গান্দেরবাল জেলার চুন্ট ওয়ালিওয়ার গ্রামে রশিদ আহমেদ মুঘলের বাড়িতে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা যখন জোর করে ঢুকে পড়ে, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর।

প্রায় মধ্যরাতে, সশস্ত্র ব্যক্তিরা জানালা ভেঙে মুঘলদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তখন বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন।

সশস্ত্র ব্যক্তিরা ইশফাককে খুঁজতে এসেছিল। পরিবারটি জানায়, ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য কাজ করতেন ইশফাক।

নাসিমা সেই রাতের ঘটনা স্মরণ করে বলেন, ‘তিনি পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা তাকে গুলি করে।’

পরিবারের অন্য সদস্যরা চিৎকার করলে ইশফাকের লাশ নিয়ে গভীর রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায় সশস্ত্র বিদ্রোহীরা।

এ ঘটনার ২৬ বছর পর গত মার্চে তাদের জীবনে ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা।

গত ৩১ মার্চ ৩২ বছর বয়সী রশিদকে ভারতীয় সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করে।

সেনাবাহিনী বলেছে, বিদ্রোহীদের সঙ্গে গোলাগুলির সময় রশিদ নিহত হন। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, এটা ছিল সাজানো অভিযান। তারা একে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে উল্লেখ করেছেন।

আরো মর্মান্তিক বিষয় হলো, রশিদকে দাফন করা হয় সীমান্ত শহর কুপওয়ারার কথিত বিদ্রোহীদের জন্য চিহ্নিত একটি কবরস্থানে।

কাশ্মীর সংঘাত:

দুই ভাইয়ের এই হত্যাকাণ্ড – একজন সন্দেহভাজন বিদ্রোহীদের হাতে এবং অন্যজন সেনাবাহিনীর হাতে নিহত – বহু দিক থেকেই কাশ্মীরে কয়েক দশক ধরে ঘটে চলা ট্র্যাজেডিকেই তুলে ধরে।

কাশ্মীর হলো পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত একটি হিমালয় অঞ্চল। ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে ভারতীয় অংশে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহ দমন করার জন্য নয়াদিল্লি প্রায় ১০ লাখ সেনা পাঠায়। তারপর থেকে এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক।

২০১৯ সালে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলে ভারত-বিরোধী মনোভাব তীব্রতর হয়, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে দেয়। এই ধারাটি কাশ্মীরকে আংশিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিল। এরপর অঞ্চলটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে—জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখে—বিভক্ত করে নয়াদিল্লির সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়।

মুঘল পরিবারটি কাশ্মীরের গুজ্জর সম্প্রদায়ের অন্তর্গত, যারা যাযাবর মুসলিম উপজাতি এবং ঐতিহাসিকভাবে ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে। ১৯৮৯ সালে যখন সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়, তখন গুজ্জরদের ভারতীয় বাহিনীর ‘চোখ ও কান’ হিসেবে দেখা হতো, কারণ তারা গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করত এবং মাঝে মাঝে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানে সেনাদের সহায়তা করত।

তবে, কালের বিবর্তনে এই সম্পর্কটি নষ্ট হয়ে গেছে। একসময় সম্মুখসারির সম্প্রদায় হিসেবে বিশ্বস্ত গুজ্জর এবং বাকরওয়ালরা এখন ক্রমবর্ধমানভাবে সেই ব্যবস্থারই চাপের মুখে পড়ছে, যাকে তারা একসময় সমর্থন করত।

‘আমার ভাই বিদ্রোহী ছিল না’

কাশ্মীরে এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। রশিদ বিদ্রোহী ছিল-সেনাবাহিনীর এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেন তারা। সেইসঙ্গে ৩১ মার্চের ‘এনকাউন্টার’-এর তদন্তের দাবি জানান।

রশিদের বড় ভাই, দিনমজুর এজাজ আহমেদ মুঘল আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি আমার কাজে ব্যস্ত ছিলাম, এমন সময় স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে ফোন আসে। তিনি জানান যে আমার ভাই দুর্ঘটনায় পড়েছে এবং আমি যেন অবিলম্বে থানায় পৌঁছাই।’

এজাজ যখন গান্দেরবাল থানায় পৌঁছান, তখন তাকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে শ্রীনগরের অন্য একটি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে একটি লাশ পড়ে থাকতে দেখেন।

এজাজ বলেন, ‘পুলিশ বলেছে আপনার ভাই একজন জঙ্গি ছিল এবং সেনাবাহিনী তাকে এনকাউন্টারে হত্যা করেছে। তার মুখটা ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছিল, সম্ভবত তার পরিচয় গোপন করার জন্য। আমি তার পা দেখে তাকে শনাক্ত করেছিলাম ‘”

রশিদ ছিলেন তাদের গ্রামের একমাত্র স্নাতক। তিনি তার সম্প্রদায়ের প্রধানত নিরক্ষর মানুষদের প্রয়োজনীয় সরকারি নথি পেতে সাহায্য করত।

যেদিন তাকে হত্যা করা হয়, সেদিন রশিদ গ্রামবাসীর কিছু নথি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। এজাজ বলেন, ‘সে আর ফেরেনি এবং তার ফোনও বন্ধ ছিল।’

পরদিন সকালে, কাছের জঙ্গলে সেনাবাহিনীর অভিযানের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এজাজ বলেন, তখনই লোকজন রশিদের হত্যার খবর জানতে পারে।

তিনি প্রশ্ন তোরেন, ‘আমার ভাই, যে আগের দিন পর্যন্ত একজন সাধারণ নাগরিক ছিল, সে কীভাবে হঠাৎ একজন জঙ্গিতে পরিণত হলো?’

এজাজ বলেন, রশিদের পরনে যে পোশাক পাওয়া গিয়েছিল, তা তার ভাইয়ের ছিল না। তিনি অভিযোগ করেন, হত্যার পর নিরাপত্তা বাহিনী তাকে ওই পোশাক পরিয়ে দিয়েছিল। পরিবার প্রশ্ন তুলেছে, রশিদ যদি একজন সশস্ত্র বিদ্রোহীই হয়ে থাকে, তবে পুলিশ তাকে কেন কখনো জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তার করেনি।

এ ঘটনায় সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আল জাজিরা সেনাবাহিনী এবং আঞ্চলিক পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া পায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কমকর্তা জানান, রশিদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ নেই এবং বিদ্রোহ-সংক্রান্ত কোনো মামলায় তাকে কখনো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়নি।

এই তদন্তের প্রতিবেদন আদৌ কোনোদিন প্রকাশ করা হবে কিনা-তা নিয়ে সন্দিহান মুঘল পরিবার।

জম্মু কাশ্মীর কোয়ালিশন অব সিভিল সোসাইটির (জেকেসিসিএস) সংকলিত তথ্য অনুসারে, ২০০৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ভারতীয় বাহিনীর দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্তত ১০৮টি ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত কারো বিচার হয়নি।

সূত্র: আল জাজিরা

আরএ

রাজার সফর যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সম্পর্কে ‘রিসেট বাটন’ টিপেছে

সৌদি আরবে সাটর্প তেল শোধনাগার পুনরায় চালু

যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি

মার্কিন কংগ্রেস দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যেসব সদুপদেশ দিলেন রাজা চার্লস

সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের সাজা বাড়ালো দ. কোরিয়ার আদালত

গাজায় ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় নিহত ৫, মোট প্রাণহানি ৭২ হাজার ছাড়াল

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, ইরানে ভারতের ‘চাবাহার স্বপ্ন’ কি শেষ?

দীর্ঘ বিরতির পর হরমুজ প্রণালী পার হলো এলএনজি বোঝাই জাহাজ

হরমুজ সংকটে রাশিয়া কি ইরানের অর্থনৈতিক ভরসা হতে পারবে?

‘প্রার্থনা করি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নতি না হোক’