ইসরাইলের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা ইরান যুদ্ধে তাদের অর্জনকে সাফল্যমণ্ডিত প্রমাণে নতুন করে সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন। যদিও ইরানে তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য শাসন পরিবর্তনের কিছুই এখনো সম্ভব হয়নি, তারা আগ্রাসনকে সফল হিসেবে বর্ণনার প্রয়াস চালাচ্ছেন।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দশকের পর দশক ইরানে হামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পুরোটাই ইরানের হামলা থেকে ইসরাইলকে রক্ষার প্রতিশ্রুতির ওপরই ভর করে আছে।
ইরানের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের সুযোগ ছাড়েননি তিনি। এ যুদ্ধকে ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য ‘ভাগ্য নির্ধারণকারী’ বলে বর্ণনা করছেন তিনি।
ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর প্রধান বলেছেন, ‘এ অভিযান আমাদের অস্তিত্ব ও আমাদের পূর্বপুরুষের এ ভূমিতে পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করবে।’
নেতানিয়াহুর সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের একজন এ যুদ্ধকে ‘সোনালি সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন, যার মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের গতিপথ বদলানো যাবে।
তেলআবিব-ভিত্তিক সাংবাদিক ও আমেরিকান থিংক ট্যাংক ইসরাইলি পলিসি ফোরামের উপদেষ্টা নেরে জিলবের বলেন, ‘নেতানিয়াহুর মনে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে যে মুক্তির লড়াই চলছে, বর্তমান অবস্থা তার সর্বোচ্চ ধাপ। যদিও এটি শেষ যুদ্ধ নয়, তবে ইরানের বিরুদ্ধে বড় এক যুদ্ধ।’
তিনি বলেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো জয়ের দাবি করছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে বহু আগেই ইরানে ক্ষমতাসীনদের ‘সম্ভাব্য পরিবর্তন’ হওয়ার প্রচার বন্ধ করেছেন, সেখানে ইসরাইল এখনো এ বিষয়ে কথা বলে চলছে।
ইরানে ক্ষমতাসীনদের পরিবর্তন হলে লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ফিলিস্তিনের হামাসের মতো ইসরাইলের আঞ্চলিক শত্রু সংগঠনগুলোর ইরানের অর্থ, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পাওয়ার পথ বন্ধ হবে, যা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলি খামেনিকে হত্যার পর ইরানের জনগণকে বিক্ষোভের জন্য বারবার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু নেতানিয়াহুও এখন যেন উপলব্ধি করছেন, ইরানে ক্ষমতাসীনদের বদল ছাড়াই যুদ্ধ শেষ হতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু ইসরাইলিদের বলেছেন, বিপুল বোমা হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের পক্ষে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে চাই, এটি আগের ইরান হবে না, আগের মধ্যপ্রাচ্যও আর থাকবে না এবং ইসরাইলও আগের মতো থাকবে না।’
ইসরাইলে অনেকেই নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে তেল আবিবের ওপর যুদ্ধ বন্ধ করার চাপ হিসেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমেরিকার সরকার অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে গেছে।
যুদ্ধের ওপর ইসরাইলের জোরালো সমর্থন আপাতত স্থগিত করা হয়েছে অংশত পরবর্তীতে হামলার পুনরাবৃত্তি করতে। গত বছর জুনে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে ইরানের ‘পরমাণু অস্ত্র’ ধ্বংসের দাবি করেন তিনি। যদিও তেহরান তার অধিকারে এ ধরনের সমরাস্ত্র থাকার কথা অস্বীকার করছে।
নতুন করে আট মাস পর আবার হামলার যুক্তি হিসেবে ইসরাইল বলছে, ইরান তার মিসাইল কার্যক্রম দ্রুতগতিতে বাড়াচ্ছে এবং পরমাণু প্রকল্প পুনরায় শুরু করার প্রয়াস চালাচ্ছে।
নেতানিয়াহু এখন বলছেন, ইরানের ক্ষমতাসীনদের পরিবর্তনের শর্ত তারা স্থগিত করেছেন এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ চাপে শাসন পরিবর্তনের সুযোগের অপেক্ষা করছেন। তবে ইরানের ক্ষমতাসীনদের অক্ষত রেখে দেওয়া নেতানিয়াহুর জন্য বিপদ হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র সংগঠনগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে। তারা ক্রমাগতই নেতানিয়াহুর মাথাব্যথার কারণ হবে।