যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টার মধ্যেও দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল অর্থ মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ২০২৪ সালেই প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার ইরানি অর্থ মার্কিন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ।
প্রতিবেদনটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইরানের অর্থ সরাসরি মার্কিন ব্যাংকে না গিয়ে তৃতীয় দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফ্রন্ট কোম্পানি ও মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঘুরে ডলার লেনদেনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে। ফলে তেহরানকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তৃতীয় দেশের ব্যাংক হয়ে পৌঁছাচ্ছে ডলার
ইরানের অর্থ মার্কিন ব্যাংকে পৌঁছানোর অন্যতম প্রধান পথ হলো ‘করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং’ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় বিদেশি ব্যাংকগুলো নিজস্ব মার্কিন শাখা না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকের মাধ্যমে ডলার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে পারে।
ডব্লিউএসজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় ফ্রন্ট কোম্পানি ও কারেন্সি এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করা হয়। এতে লেনদেনের প্রকৃত উৎস আড়াল করা সম্ভব হয়। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের ইরানি অর্থ মার্কিন ব্যাংকগুলোর মধ্য দিয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তেহরানের ওপর আর্থিক চাপ আরো বাড়াচ্ছে। ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা কোম্পানি ও দেশগুলোকে সতর্ক করা হচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারীদের মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
সমুদ্রে মজুত তেলও ইরানের আর্থিক লাইফলাইন
ইরানের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তেল রপ্তানি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল রপ্তানি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও তেহরান বিকল্প পথে তেল বিক্রি অব্যাহত রেখেছে।
চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। ডব্লিউএসজেতে উদ্ধৃত জাহাজ ও পণ্যবাহী তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, আগস্টে চীন প্রতিদিন ৫ লাখ ব্যারেলের বেশি ইরানি তেল আমদানি করেছে। দেশটি ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি গ্রহণ করে।
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। এতে তেলের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইরানি তেল বহনকারী নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ট্যাংকার থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের পর তা চীনে পৌঁছায় এবং কখনও কখনও অন্য উৎসের তেল হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।
ভর্টেক্সার হিসাব অনুযায়ী, এশিয়ার জলসীমায় বর্তমানে প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল ভাসমান অবস্থায় মজুত রয়েছে। এই তেলের মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার হতে পারে, যা ইরানের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সুরক্ষা তৈরি করছে।
ডলারের বদলে চীনা ইউয়ানে লেনদেন
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। ডব্লিউএসজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি তেলের লেনদেনের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ চীনা ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে।
এর ফলে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থার কিছু অংশ এড়িয়ে যেতে পারছে তেহরান। ইউয়ান ব্যবহার করে চীন থেকে পণ্য ও সেবা কেনা হচ্ছে। আবার তেলের বিনিময়ে চীনা কোম্পানির মাধ্যমে ইরানে অবকাঠামো নির্মাণের মতো লেনদেনও করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, ডলার ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প মুদ্রা ও পণ্যভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবহার করে ইরান তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু রাখার সুযোগ পাচ্ছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সিতেও ভরসা
প্রচলিত মুদ্রা ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় ইরান ক্রিপ্টোকারেন্সিকেও বিকল্প লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।
ডব্লিউএসজের উদ্ধৃত গবেষকদের মতে, বাণিজ্য, পণ্য ও অস্ত্র সংগ্রহসহ বিভিন্ন কাজে ইরান কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করেছে। চীনা ক্রেতাদের কাছ থেকে তেল বিক্রির অর্থ গ্রহণেও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ডিজিটাল মুদ্রা জব্দ করেছে। তবে ক্রিপ্টো লেনদেনের বিকেন্দ্রীভূত ও আন্তর্জাতিক প্রকৃতির কারণে এর ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ এখনও কঠিন।
হংকং ও দুবাইয়ে শেল কোম্পানির জাল
ডলারের প্রয়োজন পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারছে না ইরান। আমদানি, সামরিক সরঞ্জাম কেনা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নের মতো কাজে ডলারসহ প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রয়োজন রয়েছে দেশটির।
এ কারণে হংকং ও দুবাইয়ের মতো আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে শেল কোম্পানি ও মানি এক্সচেঞ্জের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে তেহরান। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানি তেল ও অন্যান্য রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থ ডলার, ইউরো ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহামে রূপান্তর করা হয়। একই সঙ্গে এসব অর্থের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সম্পর্কও আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।
এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলে আরেকটি সামনে আসে
ইরানের এই আর্থিক নেটওয়ার্ক ভাঙতে মার্কিন ট্রেজারি ব্যাংক, কোম্পানি ও ব্যক্তির ওপর ধারাবাহিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনলেই পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না।
সম্প্রতি মিশরের ব্যাংক ব্যাংক মিসরের সংযুক্ত আরব আমিরাতের কার্যক্রম নিয়ে এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে। মার্কিন ট্রেজারি জানিয়েছে, ব্যাংকটির ইউএই শাখা ইরানের ছায়া ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্ভাব্যভাবে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন প্রক্রিয়া করেছে। এরপর ব্যাংকটির মার্কিন করেসপন্ডেন্ট অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ডলার লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত একই আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অবকাঠামো যেমন যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাপক আর্থিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়, তেমনি সেটিই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অর্থের জন্য পরোক্ষ পথও তৈরি করতে পারে।
অস্ত্রশিল্পেও পৌঁছাচ্ছে অর্থ
ইরানের ছায়া আর্থিক নেটওয়ার্ক শুধু দেশটির অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করছে না; এর মাধ্যমে সামরিক কর্মসূচির প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহের পথও তৈরি হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানি ক্রেতারা চীনা কোম্পানির কাছ থেকে ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করতে পারছে। কিছু সরবরাহকারী এসব পণ্যের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে অবগত নাও থাকতে পারে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান এত ছোট বা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে এতটা বিচ্ছিন্ন যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ তাদের ওপর তুলনামূলকভাবে কম পড়ে।
ইরানের শাহেদ আক্রমণাত্মক ড্রোনকে এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ডব্লিউএসজে। এই ড্রোনে চীনা তৈরি বিভিন্ন উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা বনাম ডলারের আধিপত্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের অর্থপ্রবাহ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হলেও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকিও রয়েছে। করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করলে বিভিন্ন দেশ বিকল্প হিসেবে চীনা ইউয়ান বা অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থার দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারে।
এর ফলে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের কেন্দ্রীয় ভূমিকাও দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা যত কঠোর হচ্ছে, তেহরানও তত বেশি বিকল্প আর্থিক পথ তৈরি করছে—ডলার, তেল, ইউয়ান, ক্রিপ্টোকারেন্সি, শেল কোম্পানি ও তৃতীয় দেশের ব্যাংকিং নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে। ফলে ওয়াশিংটনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ইরানের অর্থপ্রবাহ বন্ধ করা নয়; একই সঙ্গে এমনভাবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা, যাতে বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের দীর্ঘদিনের প্রভাবও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
এআরবি