নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসের জেরে আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। গত বুধবারের এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ৯০০-এর বেশি লোক। অপরদিকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার ব্যক্তি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে বাড়ছে এ সংখ্যা।
এদিকে বন্যায় দুর্গতদের উদ্ধারে ষষ্ঠ দিনের মতো অভিযান পরিচালনা করছেন উদ্ধারকর্মীরা। নিখোঁজদের সন্ধানে নেপালের বন্যাদুর্গত এলাকায় সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অপরদিকে চীনের অধীন তিব্বত অঞ্চলে সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার দুই হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন।
গতকাল সোমবার নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমন ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়, বন্যায় দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৪৭ জনে। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। এছাড়া বন্যায় দুর্গত ১০ হাজার ৪৫১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, গত রোববার চীনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে জানানো হয়, বন্যায় দেশটিতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। অপরদিকে, নিখোঁজ হয়েছেন ৫৪৬ জন, যাদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে আকস্মিক এ দুর্যোগকে ‘অকল্পনীয় ও হৃদয়বিদারক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘রাসুয়ায় ভোটকোশি নদীতে ব্যাপক আকারের বন্যা মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তবে বিরূপ আবহাওয়া, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থা ও ক্রমাগত ঝুঁকির প্রতিকূল পরিবেশ অত্রিক্রম করে নাগরিকদের জীবন রক্ষায় আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
পোস্টে তিনি জানান, নেপালের সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার ২১ হাজারের বেশি কর্মী উদ্ধার অভিযানে যুক্ত রয়েছে। নেপালি প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যায় আহত হওয়ায় ২৬৭ ব্যক্তিকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৬ জন ইতোমধ্যেই সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। এছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহযোগিতাও প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে।
বালেন শাহ বলেন, বন্যায় দুর্গতদের আশ্রয়ের জন্য রাসুয়া ও নুয়াকোটের বিভিন্ন স্থানে ২৬টি আশ্রয়শিবির স্থাপিত হয়েছে। এ সব আশ্রয়কেন্দ্রে রোববার পর্যন্ত তিন হাজার ৪৫৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
এর মধ্যে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নেপালের মর্গগুলোতে লাশ ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএনএ নমুনা রেখে দিয়ে কিছু লাশ দাফন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সোমবার কিরগিজস্তান সফররত চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাংবাদিকদের জানান, বন্যায় নিখোঁজ চীনা ও বিদেশি নাগরিকদের সন্ধানে বেইজিং জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বন্যায় দুর্গতদের পুনর্বাসন ও আহতদের চিকিৎসার জন্য কাজ করছে সরকার।
এদিকে নেপালের ত্রিশূলী নদীতে হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের টানেলে আটকেপড়া ৯০০-এর বেশি কর্মীকে উদ্ধারের জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকর্মীরা। এর মধ্যে তিনশর বেশি কর্মীকে উদ্ধার করা হয়েছে। টানেলে আটকেপড়া কর্মীদের সহায়তায় ড্রিল মেশিন দিয়ে গর্ত খুঁড়ে ওই পথ দিয়ে বাতাস ও খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে শুক্রবার থেকে নেপালে কয়েক দফায় উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখতে হয়েছে। গত রোববার রাতভর বৃষ্টি ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছিল। পরে পানির মাত্রা কমে গেলে উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়, জানায় সেনাবাহিনী।
এর মধ্যে নেপালে উদ্ধার অভিযানে সহায়তায় বিশেষ দল পাঠিয়েছে চীন ও ভারত। এছাড়া জাতিসংঘ, রেডক্রস, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকা থেকে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হয়েছে দেশটিতে।
এর আগে বুধবার নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, দুই দেশের সীমান্তে হিমালয় পর্বতের দুর্গম ল্যাঙ্গট্যাঙ্গ লিরেঙ্গ শৃঙ্গের হিমবাহ ধস হয়েছিল। বিশাল আকৃতির এ হিমবাহ সীমান্তের লেন্দে নদীতে পড়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। কিছু সময় পর জমে যাওয়া পানি প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে তা অতিক্রম করলে পুরো অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।