নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
বিশ্বরাজনীতি বদলে দিচ্ছে ট্রাম্প ফ্যাক্টর। বিভিন্ন দেশে একের পর এক নির্বাচনে তা পরিষ্কার হচ্ছে। এগুলোর অধিকাংশেই জয় পাচ্ছেন ট্রাম্পবিরোধীরা।
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় গত দুই সপ্তাহে ভোটে মধ্যপন্থিরা তাদের ভাগ্য ফিরতে দেখলেন। অন্যদিকে সেসব দল হেরে গেছে যারা ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’-এর মতো কট্টর জাতীয়তাবাদী নীতি ধার করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছেন মাত্র তিন মাস হলো। কিন্তু ইতিমধ্যে তার নীতি— বিশেষ করে শুল্কারোপ এবং জোট ভাঙার মানসিকতা, বিশ্বজুড়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে।
যদিও বিশ্বব্যাপী ট্রাম্পবিরোধী শক্তির উত্থান হচ্ছে এটা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে এটি স্পষ্ট ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ট্রাম্পের কথা মাথায় রাখেন।
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে রয়েছে অনেক মিল। সেগুলো হলো— রাজনৈতিক ব্যবস্থা, খনিশিল্প এবং উভয় দেশের রাজা চার্লস। এখন দেশ দুটি একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক গল্পও ভাগ করে নিচ্ছে।
উভয় দেশেই ট্রাম্প শপথ নেওয়ার আগে মধ্য-বামপন্থি ক্ষমতাসীন দলের অবস্থা করুণ ছিল। শুধু তাই নয়, ক্ষমতা হরানোর শঙ্কায় দিন পার করছিল দলগুলো। ওই সময় জরিপে বলা হচ্ছিল, এগিয়ে রয়েছে রক্ষণশীলরা। যেসব দলের নেতারা ছিলেন ট্রাম্পের রাজনীতির গুণমুগ্ধ।
তবে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। মধ্য-বামপন্থি ক্ষমতাসীনরা রক্ষণশীল বিরোধীদের চেয়ে এগিয়ে যায় এবং জয়লাভ করে। উভয় দেশের রক্ষণশীল নেতারা কেবল নির্বাচনেই হেরে যাননি— এমনকি তারা সংসদে তাদের নিজের আসনও হারিয়েছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নির্বাচনি প্রচারে বিশদভাবে ট্রাম্পবিরোধী বার্তা দিয়ে গেছেন। শুধু তাই নয় ‘ট্রাম্প যে, কানাডার জন্য হুমকি’ সেটি জনগণের কাছে উপস্থাপন করা ছিল কার্নির নির্বাচনি প্রচারের মূল বিষয়। তবে অস্ট্রেলিয়ার নেতা অ্যান্থনি আলবানিজ এমনটি করেননি। কিন্তু উভয়েরই ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব ছিল।
কানাডিয়ান রক্ষণশীলদের প্রধান পিয়েরে পোইলিভর এবং অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণশীলদের নেতা পিটার ডাটন ব্যালট বক্সে জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। অস্ট্রেলীয় নেতা ডাটন ট্রাম্পের কিছু প্রস্তাব অজনপ্রিয় প্রমাণিত হলে তা প্রত্যাহার করেছিলেন, অথবা সহনীয় করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিশেষ করে সরকারি খাতের কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়ে। অন্যদিকে ট্রাম্প কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে হুমকি দেওয়ার পরও পোইলিভর কখনই ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসেননি।
ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা মিত্র জার্মানি প্রথম জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করেছিল। সেখানে ট্রাম্প ফ্যাক্টরের প্রভাব কম দেখা গেছে। আজ মঙ্গলবার জার্মানির নতুন চ্যান্সেলর হিসেবে শপথ নেবেন ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস। তিনি ট্রাম্পের কারণে খুব বেশি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হননি, যেভাবে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার নেতারা হয়েছেন। কিন্তু প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য নিয়ে আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের মনোমালিন্য ভোটের আগে ম্যার্ৎসকে সাহায্য না করলেও ভোটের পর থেকে করছে।
ম্যার্ৎস আর্থিক নীতি বিষয়ে কঠোর জার্মানিতে ব্যয়সীমা স্থগিত করার বিষয়টি এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা চ্যান্সেলর হিসেবে তার কাজকে আরো সহজ করে তুলবে। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, পারস্পরিক প্রতিরক্ষার প্রতি আমেরিকান প্রতিশ্রুতির বিষয়ে পুরোনো নিশ্চিয়তা চলে গেছে। গত মার্চে তিনি আইনপ্রণেতাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন, আমেরিকার সরকার আগের মতোই ন্যাটো চালিয়ে যেতে রাজি হবে?
জরিপ অনুযায়ী, কট্টর ডানপন্থি দল এএফডি ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ ধারায় চললেও তাতে তাদের খুব একটা লাভ হয়নি। যদিও ইলন মাস্ক দলটিকে সমর্থন এবং ভার্চুয়ালি দলের একটি অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন।
অস্থিরচিত্তের একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যে বিদেশের নেতাদের জন্য অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনতে পারেন বিষয়টি এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার।
স্টারমার একজন মধ্য-বামপন্থি নেতা, যিনি ট্রাম্পের আগে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তিনি নতুন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যেভাবে ব্যবসায়িক দেনদরবার করেছিলেন, তাতে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন। যদিও তিনি ট্রাম্পের সরাসরি সমালোচনা এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি যেখানে সম্ভব মিল খুঁজে বের করা এবং চেষ্টা করেছেন বৈপরীত্য এড়ানোর ।
হোয়াইট হাউসে সফল বৈঠকের পর স্টারমারের প্রতি তার রাজনৈতিক বিরোধীদের কেউ কেউ মুগ্ধ বলে মনে হয়েছিল। এই সময়ে ব্রিটেনে ট্রাম্পের মিত্র অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফ্যারেজ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির ভি পুতিনের প্রতি সহানুভূতিশীল এই অভিযোগ প্রতিহত করতে লড়াই করছিলেন।
তবে ব্রিটিশ পণ্যের ওপর আমেরিকান শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা করতে ব্যর্থ হওয়ার পর স্টারমার হতাশ হয়ে পড়েন। গত সপ্তাহে ইংল্যান্ডের কিছু অংশে আঞ্চলিক এবং অন্যান্য নির্বাচনে ভোট অনুষ্ঠিত হলে তার দল লেবার পার্টি একটি বড় ধাক্কা খায়। এটি ১৮৭টি কাউন্সিল আসনের পাশাপাশি তাদের একটি শক্ত ঘাঁটিতে একটি বিশেষ সংসদীয় নির্বাচনেও হেরেছে।
বিপরীতে ফ্যারাজের দল দুর্দান্ত সাফল্য অর্জন করেছে। এই দল কেবল সেই বিশেষ নির্বাচনে জয়লাভই করেনি, বরং দুটি মেয়র পদও জিতেছে। প্রথমবারের মতো, তার দল দেশের বেশ কয়েকটি অংশে সরকারের সর্বনিম্ন স্তরের নিয়ন্ত্রণ পেল।