হোম > বিশ্ব

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ থামাতে পারবেন কি পুতিন

আমার দেশ অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান এবং নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি কমাতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা যখন অচলাবস্থার মুখে, তখন মস্কোর কূটনৈতিক ভূমিকা কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের রাশিয়া সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুদ্ধের অবসানে আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

পুতিনের মধ্যস্থতার প্রস্তাব

গত ৮ অক্টোবর তুর্কমেনিস্তানে কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্ট স্টেটসের (সিআইএস) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে পুতিন ও পেজেশকিয়ানের বৈঠক হয়। সেখানে ইরানের সংঘাত নিরসনে সম্ভাব্য ভূমিকা রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন রুশ প্রেসিডেন্ট।

পুতিন পেজেশকিয়ানকে বলেছেন, পরিস্থিতি সমাধানে রাশিয়া নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে সব ধরনের চেষ্টা করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সংঘাতের অবসানে ইরান আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং যুদ্ধ শুরুর জন্য তেহরান দায়ী নয়।

এর আগে ৭ অক্টোবর দুই নেতার টেলিফোনে কথা হয়। ওই আলোচনায় পুতিন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগে সহায়তার প্রস্তুতির কথা জানান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএর তথ্য অনুযায়ী, মস্কো এ সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখতে এবং সহযোগিতা করতে আগ্রহী।

পেজেশকিয়ানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথ বন্ধ করতে চান না বলে জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চললে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সংগত চুক্তিতে পৌঁছানো অসম্ভব নয়। তবে ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের অধিকারকে তেহরান নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে।

ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চললেও দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস ও মতপার্থক্য বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ইরানের অভিযোগ, আলোচনার মধ্যেই দেশটির ওপর হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের শর্ত ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মতবিরোধের কারণে সমঝোতার পথ সহজ হচ্ছে না।

৮ অক্টোবর পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে নতুন প্রস্তাব বিনিময় করেছে। তেহরান এসব প্রস্তাবের কিছু সংশোধনও করেছে। প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত হলে বিদ্যমান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরবর্তী বৈঠকে বসার কথা রয়েছে বলে তিনি জানান।

এ পরিস্থিতিতে রাশিয়া দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং আলোচনার শর্ত নিয়ে সমঝোতা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনে পুতিন কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইরান-রাশিয়া সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ?

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মস্কো ও তেহরানের মধ্যে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বেড়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দুই দেশ জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক জোরদার করেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুতিন ও পেজেশকিয়ান একটি ২০ বছর মেয়াদি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেন। ওই বছরের অক্টোবরে চুক্তিটি কার্যকর হয়। এতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর কাঠামো থাকলেও এটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতাসংবলিত সামরিক জোট নয়।

ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন প্রযুক্তি রাশিয়ার ব্যবহারের বিষয়টি দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে আলোচিত হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কূটনৈতিক উপস্থিতি ও প্রভাব বজায় রাখতে চায় মস্কো।

তবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেই রাশিয়া ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নামবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এখন পর্যন্ত মস্কো প্রকাশ্যে সামরিকভাবে এই সংঘাতে সরাসরি অংশ নেয়নি। ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক উপকরণ দিয়ে রাশিয়া সহায়তা করছে—এমন প্রতিবেদন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও এ ধরনের সহায়তার পরিধি নিয়ে নিশ্চিত তথ্য সীমিত।

যুদ্ধ থেকে কি লাভবান হচ্ছে রাশিয়া?

ইরানকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি এই সংঘাত থেকে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। সংঘাতের কারণে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। উচ্চমূল্য রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ বাড়ায় ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও সামরিক অগ্রাধিকারের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ইরানের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থও বিবেচনায় রাখছে মস্কো—এমন বিশ্লেষণ রয়েছে।

তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রাশিয়ার জন্যও কূটনৈতিক ঝুঁকি বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আরও বিস্তৃত হলে আঞ্চলিক সম্পর্ক, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপর তার প্রভাব পড়বে।

পুতিন কি সত্যিই যুদ্ধ থামাতে পারবেন?

রাশিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকার পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো, মস্কোর সঙ্গে ইরানের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের সঙ্গেও রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় আছে। ফলে তেহরানের অবস্থান ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়া, আলোচনার প্রস্তাব বিনিময় এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগে রাশিয়া ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কী শর্তে সমঝোতায় রাজি হবে, ইরান কোন শর্ত মেনে নেবে এবং ইসরায়েলের অবস্থান কী হবে—এসব বিষয়ে পুতিনের নিয়ন্ত্রণ নেই। পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ থাকায় ওয়াশিংটন মস্কোর মধ্যস্থতার প্রস্তাব কতটা গ্রহণ করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক নাদের হাশেমি আলজাজিরাকে বলেছেন, সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক যোগাযোগ দেশটিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান সংকট সমাধানে পুতিনের সহায়তা চাইবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে রাশিয়া একটি কূটনৈতিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু শুধু পুতিনের সদিচ্ছা বা মস্কো-তেহরান সম্পর্কের ওপর সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে না। কার্যকর সমঝোতার জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্মতি, পারস্পরিক আস্থা এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির বাস্তব উদ্যোগ প্রয়োজন।

সূত্র: আলজাজিরা, আল-মনিটর ও আনাদোলু এজেন্সি

মার্কিনিদের সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ

নেতানিয়াহু যেভাবে ইসরাইলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী

নির্বাচনে নেতানিয়াহু হারলে ইসরাইলে কী পরিবর্তন আসবে

নেতানিয়াহুর ক্ষমতা কি থাকছে, সরকার গঠনে কি নির্ধারক হবেন মুসলিমরা

ইথিওপিয়ায় দুর্বৃত্তদের হামলায় ৬০ খ্রিষ্টান নিহত

ব্রাজিলের নির্বাচনে লুলার জয়ে আনোয়ার ইব্রাহিমের অভিনন্দন

কেন শিক্ষার্থীদের দাবির সমাধান করতে পারছে না ফ্রান্স

রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর

ব্রাজিলের নির্বাচনে লুলার জয় মেনে নিল বলসোনারোর দল

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ সাবেক মিস সুইজারল্যান্ডের