হোম > বিশ্ব

গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নিতে ট্রাম্প প্রশাসনের গোপন বৈঠক

আমার দেশ অনলাইন

ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নতুন তৎপরতা শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গত চার মাস ধরে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিনল্যান্ড এবং দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণকারী ডেনমার্কের প্রতিনিধিদের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয় আলোচনা চলছে।

গ্রিনল্যান্ড সামরিকভাবে দখল করার যে হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা থেকে তাকে সরিয়ে আনতে এবং ন্যাটো জোট ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে মূলত এই আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল। তবে এই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের ভূমিকা রাখার প্রস্তাব নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন গ্রিনল্যান্ডের নেতারা।

তারা আশঙ্কা করছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত কমে এলে ট্রাম্প আবারও পূর্ণ শক্তি নিয়ে গ্রিনল্যান্ডের দিকে মনোনিবেশ করতে পারেন। এমনকি গ্রিনল্যান্ডের কিছু রাজনীতিক আগামী ১৪ জুন ট্রাম্পের জন্মদিনকে সতর্ক থাকার দিন হিসেবে ক্যালেন্ডারে চিহ্নিত করে রেখেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র, কোপেনহেগেন ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু তথ্য উঠে এসেছে। তথ্যগুলো হলো-

স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি: যুক্তরাষ্ট্র একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চুক্তি সংশোধন করতে চাইছে, যার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতে স্বাধীন হলেও মার্কিন সেনারা সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করতে পারবে। এই ‘চিরস্থায়ী ধারা’ (ফরএভার ক্লজ) গ্রিনল্যান্ডের নাগরিকেরা একেবারেই পছন্দ করছেন না।

বিনিয়োগে ভেটো ক্ষমতা: সামরিক বিষয়ের বাইরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের যেকোনো বড় বিনিয়োগ চুক্তিতে কার্যকর 'ভেটো' দেওয়ার ক্ষমতা দাবি করছে, যাতে রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিযোগীদের সেখানে কোণঠাসা করা যায়। গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক উভয় পক্ষই এতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে আলোচনা: বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা গ্রিনল্যান্ডের তেল, ইউরেনিয়াম, রেয়ার আর্থসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ যৌথভাবে উত্তোলনের বিষয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

সামরিক সম্প্রসারণ: মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন ইতোমধ্যে সামরিক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি মারিন কোরের একজন কর্মকর্তাকে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের নার্সারসুয়াক শহরে পাঠানো হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের বিমানবন্দর, বন্দর এবং মার্কিন সেনাদের আবাসন ব্যবস্থা পরিদর্শন করার জন্য।

গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মার্কিন এই কঠোর দাবিগুলো তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর বড় ধরনের আঘাত। মার্কিন ও ডেনিশ কর্মকর্তারা মুখে গ্রিনল্যান্ডের ৫৭ হাজার মানুষের ভবিষ্যৎ তাদের নিজেদের হাতে বলে দাবি করলেও, ভেতরের দাবিগুলো মূলত তাদের হাত কয়েক প্রজন্মের জন্য বেঁধে ফেলবে।

গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্ট সদস্য জাস্টাস হ্যানসেন বলেন, ‘আমেরিকানরা যা চায় তার সব পেয়ে গেলে কোনোদিন ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’ আসবে না।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা মাইকেল নিডহ্যাম এই আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পেন্টাগনের নর্দার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল গ্রেগরি এম. গুইলোট নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে নতুন পথ উন্মুক্ত হওয়ায় সেখানে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এই আর্কটিক অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য আলাস্কা ও কানাডার পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডকেও রাডার স্টেশন ও সামরিক ঘাঁটির একটি আন্তঃসংযুক্ত শৃঙ্খলে যুক্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর এবং বিশেষ বাহিনীর সেনাদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি ঘাঁটি প্রয়োজন।

১৯৫১ সালে ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর ভিত্তি করেই এই আলোচনা এগোচ্ছে। ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে গ্রিনল্যান্ডকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য উল্লেখ করে এটি দখলের হুমকি দেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ওয়াশিংটনে পাঁচবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের গ্লোবাল পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের সহকারী সচিব ডিলান জনসন এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের উত্থাপিত জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগগুলো সব পক্ষই স্বীকার করে এবং সেগুলোর স্থায়ী সমাধানের জন্যই এই আলোচনা চলছে।

গ্রিনল্যান্ডের নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চান না, তবে আরো বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েনে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে ছাড় দেওয়ার জন্য তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান পিপালুক লিঙ্গে বলেন, ‘এটি মোটেও ন্যায্য নয়। মনে হচ্ছে সব কেড়ে নেওয়া হবে, নয়তো কিছুই নয় এমন পরিস্থিতি। আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো পরিণতি হবে যদি কোনো আগ্রাসন বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই আমরা থাকতে পারি।’

গ্রিনল্যান্ডের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ভিভিয়ান মোটজফেল্ড আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন,‘ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধ শেষ হলে গ্রিনল্যান্ডের জন্য বিপদ বাড়বে। ট্রাম্প আবারো গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মেতে উঠবেন এবং রাশিয়াও তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকার অঞ্চল আর্কটিকের দিকে মনোযোগ দেবে।

প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে মার্কিন আগ্রহের কারণে পরিবেশগত নিয়ম শিথিল করার চাপ আসতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। তবে গ্রিনল্যান্ডের ৩৩ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন তার কার্যালয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই ব্যবসা করতে পারি, তবে আমাদের পরিবেশগত নিয়ম অত্যন্ত কঠোর এবং এটি তেমনই থাকবে। গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা এবং ডেনমার্কের সাথে আমাদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমেরিকান বা অন্য কারো এতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।’

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, রাশিয়া বা চীন যেন কোনো বড় অবকাঠামো বা খনিজ সম্পদের চুক্তি না পায়, তা নিশ্চিত করতে কঠোর স্ক্রিনিং মেকানিজম ও ভেটো ক্ষমতা চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে ২০১৮ সালে একটি চীনা রাষ্ট্রীয় কোম্পানি গ্রিনল্যান্ডে নতুন বিমানবন্দর তৈরির দৌড়ে এগিয়ে গেলেও মার্কিন চাপে ডেনমার্ক হস্তক্ষেপ করে এবং পরে একটি ডেনিশ কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ডেনমার্কের কাছ থেকে ক্রমান্বয়ে স্বায়ত্তশাসন পাওয়া গ্রিনল্যান্ড পূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখলেও, বেইজিং বা মস্কোর সাথে যুক্ত সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের যাচাই করার মতো নিজস্ব গোয়েন্দা সক্ষমতা তাদের নেই। তাই কোপেনহেগেন এই স্ক্রিনিং করবে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ইনপুট থাকবে-এমন একটি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। এর ফলে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব বাড়ার বদলে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণ আরো বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী নিলসেন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু না বললেও জোর দিয়ে বলেন,‘কার সাথে ব্যবসা করা হবে সে বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকার গ্রিনল্যান্ডের থাকা উচিত।’

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

এএম

যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ‘রক্তস্রোত’ বইবে

ইরান যুদ্ধে উভয় সংকটে ট্রাম্প

ইসরাইলে আটক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত অস্ট্রেলিয়া

দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই ধর্মঘটের মুখে বিবিসির নতুন মহাপরিচালক

যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদে বন্দুক হামলা, ২ কিশোরসহ নিহত ৫

জেট ফুয়েল ও সার আমদানির ঘোষণা অস্ট্রেলিয়া সরকারের

ভারতের 'সংখ্যালঘু' নিয়ে ডাচ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক

ইরান যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন সিনেটে অষ্টম দফা ভোটের ঘোষণা

সমরাস্ত্র কিনতে আমিরাত-ইসরাইলের যৌথ তহবিল

ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযানে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন লক্ষাধিক শিশু