সালতামামি
যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে তরুণ সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা জীবন বাজি রেখে সব সময়ই সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেন। অনেকে মৃত্যুবরণ করেন, অনেকে হন আহত। বেশির ভাগ আন্দোলন সফল হয় তরুণদের প্রাণের বিনিময়ে। বতর্মান বিশ্বে ‘জেনারেশন-জেড’ বা জেন-জি বিক্ষোভ অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে, যার সূত্রপাত ২০২২ সালে এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কায়। দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার মুখে শ্রীলঙ্কার তরুণেরা ‘গণবিক্ষোভ শুরু করেন, যা আরাগালায়া’ আন্দোলন নামে পরিচিতি পায়। এই আন্দোলন পতন ঘটায় রাজাপাকসে সরকারের। পরবর্তীকালে ২০২৪ সালে জেন-জি বিক্ষোভে এশিয়ার আরেক দেশ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে জেন-জি বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বছরের শুরুতেই বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে ইন্দোনেশিয়ার ছাত্র-জনতা, যা দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার মাদাগাস্কার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। গত বছর কয়েকটি দেশের সরকার পরিবর্তনসহ বিশ্বের অনেক সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয় এই বিক্ষোভ। তবে আরব বসন্তের মতো জেন-জি বিপ্লবও ব্যর্থ হতে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কেননা, বিক্ষোভে যেসব দেশে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
মূলত ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী এই প্রজন্মের মানুষ একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। নিজের পরিচয়, মতাদর্শ ও সৃজনশীলতা প্রকাশে জেন-জি তুলনামূলকভাবে বেশি সাহসী।
ইন্দোনেশিয়ায় বেকারত্ব বাড়তে থাকা, ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই, শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ করসহ নানা অর্থনৈতিক সংকটের জেরে বছরের শুরুতেই ফুঁসে ওঠে দেশটির ছাত্র-জনতা। দেশের বিভিন্ন শহরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে ১০ মাসের বেশি সময় ধরে চলে আন্দোলন। আগস্টে শ্রমমন্ত্রীকে অপসারণে বাধ্য হয় দেশটির সরকার। এ ছাড়া দেশটির পার্লামেন্ট সদস্য বা এমপিদের বেতন বাড়ানোর প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন সে দেশের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ দমাতে পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলে নিহত হন কয়েকজন ছাত্র। পরে আন্দোলন থামাতে বরখাস্ত করা হয় অর্থমন্ত্রীসহ কয়েকজন মন্ত্রীকে।
ইন্দোনেশিয়ার পরপরই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরেক দেশ ফিলিপিন্সে শুরু হয় বিক্ষোভ। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিক থেকে শুরু হয় এ আন্দোলন। বন্যার বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতির অভিযোগে জড়িত আইনপ্রণেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিচারের দাবিতে হওয়া এ আন্দোলনে যোগ দেন সারা দেশের লাখ লাখ মানুষ। বিচ্ছিন্নভাবে এ আন্দোলন এখনো চলমান।
সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভে নামেন হিমালয়কন্যা খ্যাত নেপালের তরুণেরা। ৮ সেপ্টেম্বর জেন-জিদের বিক্ষোভের মুখে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশটি। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৭২ জন। আহত হন ১ হাজার ৩০০-এর বেশি। কারফিউ জারি করা হয় রাজধানী কাঠমান্ডুতে। তরুণদের এই তীব্র প্রতিবাদের মুখে এক দিন পর, অর্থাৎ ৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলিসহ বেশ কজন মন্ত্রী। পরে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন সুশীলা কার্কি। আর এই সবকিছুর পেছনে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেন নেপালের একজন সাবেক ডিজে এবং তার অখ্যাত অলাভজনক সংস্থা, যেখান থেকে অ্যাপ ব্যবহার করে ভিডিও গেমের মাধ্যমে বড় ধরনের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
দুর্নীতি, বেকারত্ব ও ক্রমবর্ধমান অপরাধের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর জেন-জি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে বিক্ষোভ করে। এতে গত ১০ অক্টোবর পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিনা বলুয়ার্ত । এরপর নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান জোসে জেরি।
পানি ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের জেরে ২৫ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ শুরু হয় পূর্ব আফ্রিকার দ্বীপদেশ মাদাগাস্কারে। আন্দোলন ও বিক্ষোভকারীদের পক্ষে সেনা অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় অক্টোবরে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করেন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা।
এ ছাড়া মরক্কো, মেক্সিকো, বুলগেরিয়া ও কেনিয়ায় সরকারের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন জেন-জিরা।
এসআই