ঠিক যেন ২২ বছর আগের সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্য সামনে এনে যেভাবে ইরাক আক্রমণ করা হয়েছিল, একইভাবে ইরানেও হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র। ইরাক আক্রমণের আগে বলা হয়েছিল সাদ্দাম সরকারের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। আর এবার ইরান আক্রমণের আগে বলা হলো তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে।
তৎকালীন রিপাবলিকান দলীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়র ঘোষণা দেন সাদ্দাম হোসেন ও তার দুই ছেলেকে ইরাক ছেড়ে চলে যেতে হবে। তা না হলে তাদের ভোগ করতে হবে চরম পরিণতি। ওই হুমকির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরাক আক্রমণ করেছিল। সাদ্দাম হোসেনের দুই ছেলেকে হত্যার পাশাপাশি উৎখাত করা হয় সাদ্দাম সরকারকেও।
পরবর্তীতে প্রহসনের এক বিচারের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয় প্রাচীন এক সভ্যতাকে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর প্রমাণিত হয়Ñমিথ্যা গোয়েন্দা তথ্য সামনে এনেই ইরান আক্রমণ করা হয়েছিল। কারণ, সাদ্দাম হোসেনের কাছে কোনো ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না।
২০০৩ সালে তখন ইসরাইলের আবদার মেটাতেই ইরাক আক্রমণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এবার ২০২৫ সালেও সেই ইসরাইলের দাবি মেটাতে আরেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাক আক্রমণ করলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ড ও অন্যান্য নীতিনির্ধারকের মতামত উপেক্ষা করে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছেÑএমন ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে আক্রমণ করা হলো ইরানকে।
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনসহ ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক নীতিনির্ধারক প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছেÑএমন কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। কিন্তু কোনো কিছুকেই আমলে নেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। গত শুক্রবার ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, ইরানকে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে হবে। তা না হলে কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে দেশটিকে। আর এই হুমকির পর গত শনিবার রাতেই
ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় আমেরিকা হামলা চালিয়েছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান দেন ট্রাম্প।
এর দুই ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশ্যে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, এই অভিযানটি ছিল একটি অসাধারণ সাফল্য। ইরানের আর পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও এবং ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথকে পাশে নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, যদি তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাদ না দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা এমন হামলার মুখোমুখি হবে, যা অনেক ভয়াবহ। ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেন বার্তা দিলেনÑযুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আরেকটি ইরাক বানাতে চায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ইরাক বানাতে পারবে কি নাÑসে প্রশ্নের উত্তর এ মুহূর্তে অন্তত বিশ্লেষকদের কাছে নেই। তারা বলছেন, ইরানকে ইরাকের সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হবে। ইরান কোনোভাবেই ইরাক নয়।
২২ বছর আগে ইরাক আক্রমণের আগে দেশটির হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার ধারণা এবং সেই অস্ত্র মানব অস্তিত্বের জন্য হুমকি হতে পারে—এমন বয়ান তৈরি করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্রদের পক্ষ থেকে। এবারও একেবারেই বিনা উসকানিতে ইরান আক্রমণের পর ‘একই অজুহাতে’ ইসরাইলের হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এ সংঘাতে জড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান দিয়ে হামলা চালিয়েছে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায়। অথচ ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য রাষ্ট্র। তাদের এই কর্মসূচি সব সময় নজরদারির মধ্যেই থাকে। তবুও সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতার অভিযোগেই ইরানের ওপর বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। বিপরীতে এনপিটিতে সই না করা ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রে শক্তিধর দেশ। তারা কখনই আইএইএকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইসরাইলকে বারবার জানানো হয়েছে যে, ইরানের পরমাণু বোমা বানানোর ইচ্ছা নেই। একই কথা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানালে তুলসী ‘ভুল জানেন’ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মোসাদ বলছে ইরান ১৫ দিনের মধ্যে পরমাণু বোমা বানাতে সক্ষম আর মার্কিন সংস্থাগুলো বলছে অন্তত এক বছর লাগবে।
গত ২০ জুন দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরাক যুদ্ধে ভয়াবহ ভুল করেছিল। একই কাজ কি ইরানের ক্ষেত্রেও করতে যাচ্ছে? প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রায় ২২ বছর আগে যখন মার্কিন কর্মকর্তারা ইরাক আক্রমণ করা উচিত হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন তাদের মনে একটাই প্রশ্ন ছিল—সাদ্দাম হোসেনের হাতে কি গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে? যদি থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সেগুলো ধ্বংস করা এবং সামরিক হামলার মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। তারপর যা ঘটেছিল, তা বিশ্ববাসীর জানা।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিজিটিএন মন্তব্য করেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি আবার ইরাকে করা ভুল ইরানেও করছে? তারা ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও অস্থিতিশীলতা এনেছে—ইতিহাস তা বারবার প্রমাণ করেছে।
ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান বলেছেন, আমরা সবাই একমত যে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়। কিন্তু ট্রাম্প এই লক্ষ্য অর্জনে কূটনৈতিক পথ ছেড়ে দিয়েছেন এবং তার বদলে এমন কিছু করেছেন, যা অপ্রয়োজনে আমেরিকান নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে, আমাদের সেনাবাহিনীকে আরো বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং আমেরিকাকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ এক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার বলেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাচ্ছে না। কূটনৈতিক সমাধানের জন্য আরো সময় ছিল।
ইসরাইল-ইরান চলমান সংঘাতের দশম দিনে অন্তত এ কথা বলা যায় যে, ইরানকে নিশ্চয়ই ইরাক বলা যাবে না। সবাই জানেন, ১৯৮১ সালের ৭ জুন ইসরাইলের ৮টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান প্রায় এক হাজার ১০০ কিলোমিটার উড়ে গিয়ে আচমকা ইরাকের রাজধানী বাগদাদের কাছে ওসিরাকে হামলা চালায় এবং ফরাসিদের তৈরি ওসিরাকের রিঅ্যাকটরটি ধ্বংস করে। সেখানে পরমাণু বোমার জন্য প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করা হতে পারেÑএমন ধারণার ভিত্তিতে ইরাকের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এরপর দেশটি আর সে পথে এগোয়নি।
ইরানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশটি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে সই করে ১৯৬৮ সালে। এরপর ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা অনুমোদন করে ইরান নিজেকে পরমাণু বোমামুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে তেহরান বারবার বলে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক। এটি গবেষণা ও শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য। চুক্তি অনুসারে জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থা আইএইএ নিয়মিত ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে আসছে।
পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে সই না করা ও পরমাণু বোমার অধিকারী হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে অন্য কোনো দেশকে পরমাণু রিঅ্যাকটর বসাতে দিতে নারাজ। ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সীমিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বের পরাশক্তিধর দেশগুলো ২০১৫ সালে চুক্তি করে। ইরান চুক্তি মেনে চললেও প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসেন। ফলে চুক্তিটি অকার্যকর হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের পথে হাঁটতে শুরু করে ওয়াশিংটন।
দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প পরমাণু নিয়ে ইরানের সঙ্গে নতুন করে চুক্তির জন্য আলোচনার নির্দেশ দেন। সেই আলোচনা পঞ্চম দফা পর্যন্ত গড়ায়। ষষ্ঠ দফা শুরুর ঠিক আগে ইসরাইল আচমকা ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। উদ্দেশ্য—ইরানের পরমাণু প্রকল্প ধ্বংস করা। যদিও এর সঙ্গে তেহরানে সরকার পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছে তেল আবিব।
ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযান ২০০৩ সালে শুরু হয়ে চলেছিল ২০১১ সাল পর্যন্ত। তারপরও তা শেষ হয়নি। এখনো ইরাকে মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি আছে। সেই ঘাঁটি লক্ষ করে ইরান সমর্থিত যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হামলা মাঝেমধ্যেই সংবাদ শিরোনাম হয়। সে হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক এখনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরতে পারেনি।
তেমনি ইরানেও কি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিকল্পনা করছে ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্র? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানিদের একটি অংশ বর্তমান শাসকবিরোধী হলেও তারা আগ্রাসন বা বিদেশি হামলার বিপক্ষে। আর চলমান প্রেক্ষাপটে সেখানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরো জোরালো হচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানিরা তাদের দেশে ইসরাইলের এই আক্রমণ ভুলবে না। যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে যোগ দেওয়ায় ইরান এখন মার্কিনিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলো। এর ফলে যুদ্ধ আরো বিস্তৃত রূপ নিতে পারে। এই সংঘাত চলতে পারে আরো অনেক বছর।