ইরানের পাল্টা হামলা
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালায় আমেরিকা ও ইসরাইল। পাল্টা জবাবে ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি ও দূতাবাস লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এসব হামলায় তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোয় কমপক্ষে ১২ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকিরা বিদেশি নাগরিক।
পাকিস্তানের নাগরিক মুরিব জামান দুই দশক ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। পরিবার থেকে এক হাজার মাইলেরও বেশি দূরে বসবাস করতেন। মাসে ৩০০ ডলার করে দেশে পাঠাতেন তিনি। আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির সুন্দর শহরটিকে তার প্রত্যন্ত গ্রামের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ মনে করেই এখানে আবাস গড়েছিলেন তিনি। কেননা, পাকিস্তানি তালেবান জঙ্গিরা ঘুরে বেড়াত তার গ্রামে। কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারান মুরিব। এত দূরের দেশে যুদ্ধে প্রিয়জনের মৃত্যু মানতে পারছে না জামানের পরিবার। মুরিব জামানের চাচাতো ভাই ফরমান খান ফোন সাক্ষাৎকারে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক বিবৃতিতে জানতে পারেন তার ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ। তার বলেন, পাকিস্তানের অনেক পরিবারই নিরাপদ জীবনের আশায় প্রিয়জনদের মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করতে পাঠায়। কিন্তু এখন সেখানেও তারা নিরাপদ নয়।
৪০ বছর বয়সি জামানের মতো লাখ লাখ নারী-পুরুষ উপসাগরীয় দেশগুলোয় চাকরির সুবাদে বসবাস করেন। অভিবাসী এসব কর্মীই এখানকার অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ দেশগুলো মূলত এসব বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল। আমেরিকা-ইসরাইলের আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোয় শত শত ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান, যার চড়ামূল্য দিতে হচ্ছে অভিবাসীদের। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান এবং বাহরাইনে কমপক্ষে ১২ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকিরা বিদেশি নাগরিক।
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ১০ মার্চ একটি আবাসিক ভবনে হামলা চালায় ইরান। এতে নিহত হন ২৯ বছর বয়সি এক নারী। তবে ইরানের দাবি, তারা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নয়; উপসাগরীয় দেশগুলোর আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি এবং দূতাবাসে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু ইরানের হামলা বেসামরিক অবকাঠামোতেও আঘাত করেছে, পাঁচ তারকা হোটেলে আগুন লেগেছে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও হামলা থেকে বাঁচতে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তারপরও পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে।
এজেন্সি ফ্রান্স-প্রেস জানিয়েছে, গত সপ্তাহে কুয়েতে একটি আবাসিক ভবনে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত হয় ১১ বছর বয়সি এলনা আবদুল্লাহ নিয়া নামে একটি মেয়েশিশু। সে ইরানি নাগরিক। আর রোববার সৌদি আরবে তাদের কোম্পানির আবাসিক এলাকায় একটি ‘সামরিক প্রজেক্টাইল’ পড়ে দুই সন্তানের বাবা মোশাররফ হোসেন নামে এক বাংলাদেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং তার এক সহকর্মী নিহত হন। মোশাররফের ভাই জানান, তার মৃত্যু পরিবারকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। কারণ, তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
যদিও সাধারণের মনোযোগ এ অঞ্চলে ভ্রমণ বা বসবাসকারী আমেরিকা এবং ইউরোপের নাগরিকদের নিরাপত্তার ওপর। তারা অভিবাসী কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়ে একেবারেই উদাসীন। মূলত আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নাগরিকই উপসাগরীয় অঞ্চলে বেশি বসবাস করেন। ফলে নিহতদের বেশিরভাগই বিদেশি নাগরিক। কারণ, তারা এ অঞ্চলের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। সৌদি আরবে বিদেশি বাসিন্দারা জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। আমিরাত এবং কাতারে এ অনুপাত আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ।
এ অবস্থায় সংঘাত শুরুর পর স্বল্পবেতনের এসব অভিবাসী কর্মী সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছেন। কারণ, তাদের আবাসস্থল থেকে বের হওয়ার রাস্তা একেবারেই অপরিসর। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলে বিস্ফোরণ বা আগুন তাদের জীবনের ঝুঁকি বাড়ায়। আর এসব কর্মীর বেশিরভাগই মুদি দোকানের ক্যাশিয়ার, স্যানিটেশন কর্মী এবং ডেলিভারি ড্রাইভার হিসেবে কাজ করেন। ফলে কর্মস্থলে যেতেই হয় তাদের। অন্যদের মতো ঘরে বসে বা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়া সম্ভব হয় না তাদের।