দক্ষিণ চীন সাগরে গত মাসে চার দিন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। এ সময় জাহাজটির শৌচাগার, রান্নাঘরের সেবা ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অচল হয়ে যায়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেই বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হয় প্রায় ১০ হাজার টন ওজনের যুদ্ধজাহাজটির নাবিকদের।
যুক্তরাষ্ট্রের ৭ম নৌবহর জানিয়েছে, জাহাজটির প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দায়িত্বের কারণে দেশটির নৌবাহিনীর ওপর চাপ বাড়ছে। এর মধ্যেই নতুন করে এ ঘটনা নৌবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
৭ম নৌবহরের মুখপাত্র কমান্ডার ম্যাথিউ কোমার সিএনএনকে বলেন, আরলেই বার্ক শ্রেণীর গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস বেনফোল্ড ২৪ জুলাই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিয়মিত কার্যক্রমে ছিল। এ সময় জাহাজটির জেনারেটরে ‘প্রকৌশলগত ত্রুটি’ দেখা দেয়।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর জাহাজটি নিজে থেকে চলাচলের সক্ষমতা হারায়। এর রান্নাঘরের সেবা, শৌচাগার, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পানযোগ্য পানির সরবরাহও ব্যাহত হয়।
কোমার বলেন, এ ঘটনায় জাহাজের কোনো নাবিক আহত হননি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাবিকেরা দৃঢ়তা, পেশাদারত্ব ও স্থিরতার পরিচয় দিয়েছেন।
জাহাজটির বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ এখনো তদন্ত করা হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইউএসএনআই নিউজ প্রথম এ ঘটনা প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাটি দক্ষিণ চীন সাগরে ঘটেছিল।
জুলাইয়ের শেষ দিকে দক্ষিণ চীন সাগরে দিনের তাপমাত্রা ছিল গড়ে ৮৯ থেকে ৯৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট, অর্থাৎ ৩২ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে বিদ্যুৎ ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া চার দিন অবস্থান করা নাবিকদের জন্য কঠিন ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন কার্ল শুস্টার এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। একবার পুয়ের্তো রিকোর কাছে একটি ডেস্ট্রয়ারে প্রায় চার ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ছিলেন তিনি।
শুস্টার বলেন, এমন পরিস্থিতি বেশ চাপের। অপারেশন কর্মকর্তারা নাবিকদের মনোবল ও কার্যক্রম নিয়ে চিন্তিত থাকেন। প্রকৌশলীরা সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত থাকেন। নেভিগেটর জাহাজটি কোন দিকে ভেসে যাচ্ছে এবং সামনে কী ধরনের আবহাওয়া আসছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। জাহাজের কমান্ডিং ও নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হয় এবং কখন সহায়তা আসবে, তা নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়।
তার মতে, পুয়ের্তো রিকোর দক্ষিণ-পূর্ব সমুদ্রসীমায় চার ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকার চাপ দক্ষিণ চীন সাগরে চার দিন এমন অবস্থায় থাকার তুলনায় কিছুই নয়।
মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় আরেকটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস রবার্ট স্মলস বেনফোল্ডের জন্য রান্না করা খাবার সরবরাহ করে। জাপানে অবস্থানরত ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের অন্যান্য জাহাজও ওই চার দিন বেনফোল্ডকে সহায়তা করে।
পরে বেনফোল্ডকে মেরামতের জন্য ফিলিপাইনের সুবিক বে-তে টেনে নেওয়া হয়। ৮ আগস্ট এর মেরামতের কাজ শেষ হয়। এরপর জাহাজটি আবার দায়িত্বে ফিরে যায়।
ইউএসএস বেনফোল্ড সাধারণত ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে ঘিরে থাকা ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের অংশ হিসেবে কাজ করে। জর্জ ওয়াশিংটন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে। সেখানে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও এর স্ট্রাইক গ্রুপকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বেনফোল্ডকে জর্জ ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের কাছাকাছি জলসীমায় পাঠানো হয়েছে কি না, তা মার্কিন নৌবাহিনী জানায়নি। ইউএসএনআই নিউজ জানিয়েছে, জাপানের জাহাজ পর্যবেক্ষকেরা বেনফোল্ডকে জাপানে পৌঁছাতে দেখেছেন।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডের আওতাধীন এলাকায় মার্কিন নৌবাহিনীর কোনো ডেস্ট্রয়ারের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে মে মাসে ইউএসএস হিগিন্স ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ ও চলাচলের সক্ষমতা হারিয়েছিল। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় ‘প্রকৌশলগত ত্রুটি’র কারণে ওই ঘটনা ঘটেছিল বলে মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছিল।
বেনফোল্ড ও হিগিন্সের মতো আরলেই বার্ক শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর সারফেস ফ্লিটের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ। এ ধরনের ৭০টির বেশি ডেস্ট্রয়ার বর্তমানে নৌবাহিনীর বহরে রয়েছে।
জাহাজগুলোর বিভিন্ন বিন্যাস অনুযায়ী দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০০ ফুট এবং ওজন প্রায় ১০ হাজার টন। প্রতিটি জাহাজে ৩২৯ থেকে ৩৫৯ জন নাবিক থাকতে পারেন।
এএম