‘সবাই তো সুখী হতে চায়, তবু কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না’—কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী মান্না দের কণ্ঠে গাওয়া এই কালজয়ী গানটি মানুষের চিরন্তন এক সত্যকেই তুলে ধরে। সুখের প্রত্যাশা সবার, কিন্তু সেই সুখ সবার জীবনে সমানভাবে ধরা দেয় না।
সুখের খোঁজে মানুষ নানাভাবে ছুটে বেড়ায়। কেউ দেশান্তরী হয়, কেউ আপনজনদের সান্নিধ্যে শান্তি খোঁজে, আবার কেউ অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদার মধ্যে জীবনের পরিতৃপ্তি খুঁজে ফেরে। কিন্তু মানসিক প্রশান্তি, তৃপ্তি, আনন্দ ও জীবনের সার্থকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সুখের অনুভূতি অধিকাংশ মানুষের কাছেই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
এখানেই বড় প্রশ্ন—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন কিংবা মাথাপিছু আয় বাড়লেই কি মানুষ প্রকৃত অর্থে সুখী হয়? একটি দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেলেই কি তার নাগরিকদের জীবনসন্তুষ্টিও বাড়ে? বাস্তবতা বলছে, এই দুইয়ের মধ্যে সরল কোনো সমীকরণ নেই। এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রকাশিত হচ্ছে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট বা বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন। ২০২৬ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ১৪৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৭তম। টানা নবম বারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে ফিনল্যান্ড। এরপর রয়েছে আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, কোস্টারিকা, সুইডেন ও নরওয়ে। শীর্ষ দশে আরো রয়েছে নেদারল্যান্ডস, ইসরাইল, লুক্সেমবার্গ ও সুইজারল্যান্ড।
মানুষের সুখী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনেই কোনো না কোনোভাবে ভালো থাকার বাসনা কাজ করে। মানুষ মনে করে আরেকটু অর্থ থাকলে সুখী হব, ভালো চাকরি পেলে জীবন বদলে যাবে, নিজের বাড়ি বা গাড়ি কিনতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য পূরণের পর সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নতুন প্রাপ্তি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়, তৈরি হয় নতুন চাহিদা।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৫ বছর ধরে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে—টাকা, খ্যাতি বা ক্ষমতা মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে সুখী করে না। মানুষকে সবচেয়ে বেশি সুখী ও সুস্থ রাখে তার সুন্দর ও গভীর সামাজিক সম্পর্কগুলো।
জাতিসংঘের সুখী দেশ নির্ধারণের ছয়টি মানদণ্ডের প্রতিটিতে ফিনল্যান্ড বিশ্বসেরা স্কোর অর্জন করায় বারবার শীর্ষে রয়েছে। এর কারণ হিসেবে দেখা গেছে, দেশটিতে স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত হয়। ফলে অসুস্থতা বা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নাগরিকদের মনে কোনো বাড়তি মানসিক চাপ বা আর্থিক দুশ্চিন্তা থাকে না। আবার কোনো নাগরিক চাকরি হারালে, অসুস্থ হলে বা অবসরে গেলে রাষ্ট্র তাকে শক্তিশালী আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা দেয়। ফলে সেখানে ‘হাউজিং ফার্স্ট’ নীতির কারণে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় শূন্য।
এছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিমুক্ত এবং স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থার দেশগুলোর একটি ফিনল্যান্ড। ফলে দেশটির জনগণ তাদের সরকার, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও কর ব্যবস্থার ওপর গভীর আস্থা রাখে। শুধু তাই নয়, দেশটির মানুষের পারস্পরিক সামাজিক আস্থাও অনন্য।
অন্যদিকে, দেশটির নাগরিকদের কাজের ক্ষেত্রেও রয়েছে স্বস্তি। ফিনিশ সংস্কৃতিতে অতিরিক্ত কাজ বা ওভারটাইম করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। সেখানে সপ্তাহে কাজের সময় সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা এবং কর্মীরা দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের বাৎসরিক পেইড ছুটি পান। অফিস শেষ হওয়ার পর বাকি পুরো সময়টা তারা পরিবার, নিজের শখ এবং প্রকৃতির মাঝে কাটান। এই ভারসাম্য মানুষের মানসিক অবসাদ দূর করে।