মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা মোহন মিয়াজি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউক্রেনের বিপক্ষে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে যে ভয়বহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই দেখা যায় মানুষ মরে পড়ে রয়েছে।’
মিয়াজি বলেন, ‘আসলে ফ্রন্টলাইন (সম্মুখযুদ্ধ) মানে প্রতিটি সেকেন্ডেই মৃত্যুর ভয়। সব সময় গুলি, আর্টিলারি, ড্রোন হামলা চলতেই থাকে...যেখানে-সেখানে ল্যান্ডমাইন। হাঁটার সময় একটু এদিক-সেদিক হলেই মাইন বিস্ফোরণ হয়ে প্রাণ চলে যেতে পারে।’
এই যুদ্ধে তার এক বন্ধুও প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানান।
মিয়াজি বলেন, ‘আমার বন্ধু আশিকুর, ওর বাড়ি নোয়াখালী, সেও আমার সঙ্গে যুদ্ধে গিয়েছিল। কয়েক মাস আগে ও ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মারা গেছে।’
খাবারের কষ্টের বিষয়ে বলেন, ‘যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে প্রায়ই খাবার পৌঁছাতে সমস্যা হয়। তখন দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হয়।’
এমন পরিস্থিতিতে রুশ সৈন্যশিবির থেকে পালিয়ে সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছেন মুন্সিগঞ্জের এই তরুণ। যদিও পালিয়ে আসার বিষয়টি সহজ ছিল না।
সেনাক্যাম্পের চারপাশে সব সময় কড়া গার্ড থাকে। পালানোর সুযোগ নেই। মিয়াজি জানান, ‘কিন্তু আমার কিছুদিনের ছুটি ছিল। তখন ক্যাম্পের বাইরে এসে সেখান থেকে বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির সহায়তায় দেশে ফিরে এসেছি।’
তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশটির অনেক নাগরিক এখনো রাশিয়ার পক্ষে লড়ছেন।
সম্মুখ সারিতে যুদ্ধ করতে গিয়ে তারা প্রাণ হারাচ্ছেন, হাত-পা হারিয়ে পঙ্গুত্বও বরণ করছেন কেউ কেউ।
কারো কারো ক্ষেত্রে আবার মাসের পর মাস কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কী বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন?- জানেন না দেশে থাকা স্বজনরা।
কিন্তু ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধে কেন এবং কীভাবে জড়িয়ে পড়ছেন বাংলাদেশের নাগরিকরা?
অনুসন্ধানে বিবিসি বাংলা এমন একটি দালাল চক্রকে খুঁজে পেয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ভালো চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে সাধারণ মানুষদের রাশিয়া নিয়ে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
দালালদের এই চক্রটির সঙ্গে ভারতীয় দু'জন নাগরিকের জড়িত থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, পড়াশোনা ও কাজের সুবাদে বাংলাদেশ থেকে যারা রাশিয়া যাচ্ছেন, তাদের মধ্য থেকেও অনেকে মোটা অর্থ ও স্থায়ী নাগরিকত্বের প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন বলেও জানা যাচ্ছে।
রাশিয়ায় কাজে গিয়ে যুদ্ধে জড়াচ্ছে যেভাবে
যুদ্ধে যাওয়ার মাস ছয়েক আগে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে চীনা একটি তেল-গ্যাস কোম্পানিতে কাজ করতে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন মোহন মিয়াজি। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই চাকরিটা ছেড়ে দেন তিনি।
মিয়াজি বলেন, ‘কোম্পানিটা বেতন-ভাতা ভালোই দিতো, কিন্তু সাইবেরিয়া অঞ্চলে হওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ছিল। গড় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৪০ থেকে ৫০ ডিগ্রি নিচে নেমে যেত। চারদিকে বরফে ঢাকা। সেজন্য সবাই অতিষ্ঠ হয়ে অন্য কোম্পানিতে কাজের সুযোগ খুঁজছিল।’
এর মধ্যে ওই কোম্পানিতে কর্মরত আরেক বাংলাদেশি চাকরি ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
মোহন মিয়াজি বলেন, ‘আমার ওই সহকর্মীর নাম সোহেল। সে আমার পাশের রুমে থাকতো। রাশিয়ায় আসার আগে বাংলাদেশে যখন মেডিকেল (স্বাস্থ্য পরীক্ষা) করি, তখনও আমরা একসঙ্গেই করছিলাম। সে রাতের আঁধারে পালিয়ে যুদ্ধে চলে যায়।’
ওই সহকর্মীর পরামর্শ ও উৎসাহেই পরবর্তীতে রুশ সেনাবাহিনীর যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান মুন্সিগঞ্জের এই তরুণ।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধে যাওয়ার পর সোহেল একটা হটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলে। সেখানে সে যুদ্ধের বিভিন্ন ভিডিও শেয়ার করতে থাকে এবং সবাইকে যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে ইন্সপায়ার (উৎসাহিত) করতে থাকে।
তিনি আরো বলেন, ‘সোহেল বলেছিল, সেখানে সে ভালো আছে। তাকে সরাসরি যুদ্ধে যাওয়া লাগেনি। ক্যাম্পেই বিভিন্ন কাজ করে। আমরা যোগ দিলে আমাদেরও যুদ্ধে পাঠানো হবে না। সেজন্য রাজি হয়েছিলাম।’
রাজি হওয়ার পর সোহেল নামের ওই সহকর্মী একজন রুশ নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন মোহন মিয়াজিকে। সেই নারীই পরবর্তীতে তাকে রুশ সেনা দফতরে নিয়ে যান।
মিয়াজি বলেন, ‘সেখানেও ওই ম্যামকে আমি জানিয়েছিলাম যে, সরাসরি যুদ্ধ যেতে চাই না। আমি যেহেতু ইলেক্ট্রনিক কাজে স্কিলড (দক্ষ), সেজন্য ওইকাজে দিতে বলছিলাম। ম্যামও বললো, হ্যাঁ, ওখানে এই কাজ আছে।’
কিন্তু কিছুদিন না যেতেই বাংলাদেশি এই তরুণের বুঝতে বাকি থাকে না যে, তাকে আসলে মিথ্যা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ওই ম্যামের কথামত ক্যাম্পে কমান্ডারকে আমি আমার সব স্কিলস দেখাই। কিন্তু সে আমাকে বলে, আপনি ইলেক্ট্রনিক কাজে এক্সপার্ট আছেন, কিন্তু আপনার তো এখানে চুক্তি হয়েছে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। কাজেই আপনাকে অন্য কাজে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সে (রুশ নারী) আপনার সাথে প্রতারণা করেছে।’
'বেশিরভাগই হয় পঙ্গু, না হয় মৃত'
মিয়াজি চীনা যে কোম্পানিতে কাজ করতেন, সেখানকার এক ডজনেরও বেশি কর্মী পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে বর্তমান ও সাবেক কর্মীরা।
যারা যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার।
মিয়াজির মতো তারাও সোহেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। যদিও বর্তমানে রুশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে কেউই নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।
রুশ সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশি যুবক রাসেল শিকদার (ছদ্মনাম) বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘সোহেল আমাদেরকে বলতো, বিদেশি নাগরিক কাউকে রাশিয়া যুদ্ধে পাঠায় না। বাহিরের কাজ দেয়। স্যালারি (বেতন) ভালো, রাশিয়ার পাসপোর্ট পাওয়া যাবে। তো উনি (সোহেল) বলতেন, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করো, আমি আসার ব্যবস্থা করে দিবো। এভাবে আমরা ধাপে ধাপে কোম্পানি থেকে অনেকজন যুদ্ধে আসি।’
সাবেক সহকর্মীদের মধ্যে যারা একসঙ্গে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই হতাহত হয়েছে বলে জানান তিনি।
ওই যুবক বলেন, ‘আমরা যারা একসঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই গোলাগুলিতে হয় পঙ্গু হয়ে গেছে, না হয় মারা গেছে। সোহেল ভাই যদি মিথ্যা কথা বলে আমাদেরকে না আনতো, তাহলে আমরা কখনোই যুদ্ধে আসতাম না।’
অভিযুক্ত মোহাম্মদ সোহেল নিজেও বর্তমানে রুশ সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ করছেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি রুশ বাহিনীর পক্ষে সৈন্য সংগ্রহের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এছাড়া সাবেক সহকর্মীদের কয়েকজনকে রাশিয়ার সেনা বাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে সাহায্য করার কথা স্বীকার করলেও সেটার বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।
যদিও বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
কিন্তু ফেসবুকে তার যে ভেরিফাইড প্রোফাইল রয়েছে, সেখানে বছরখানেক ধরেই নিয়মিতভাবে যুদ্ধের ময়দান থেকে ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে তাকে। সেগুলোতে রুশ সেনাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ভারি অস্ত্র ও যুদ্ধে তাদের অর্জনকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
তার এসব ভিডিও লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে এবং কমেন্টে বাংলাদেশ থেকে অনেকেই রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
দালাল চক্রের প্রতারণা
পরিচিত মুখের বাইরেও যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশি অনেক অপরিচিত মুখ দেখেছেন বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন চীনা কোম্পানি থেকে যুদ্ধে যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের কয়েকজন।
মোহন মিয়াজি বলেন, ‘অপরিচিতদের মধ্যে আমার সঙ্গে একজনের দেখা হয়েছিল, যে স্টুডেন্ট ভিসায় রাশিয়া গিয়েছিল। আরেকজন ছিল মধ্যবয়সী। সে প্রতারণার শিকার হয়ে বাংলাদেশ থেকে আসছিলো।’
রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি আরেক তরুণও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন।
বলেন ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধরত এক বাংলাদেশি, যিনি নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের নামপ্রকাশ করতে রাজি হননি, তিনি বলেন, ‘আমাদের আগের ব্যাচে প্রায় ৪৭ জনের একটা বাংলাদেশি টিম যুদ্ধের জন্য এসেছিল। উনারা দালাল চক্রের মাধ্যমে এসেছে বলে আমরা পরে জানতে পারি।’
বাংলাদেশ থেকে যারা দালাল চক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন, তেমনই একজন রাজবাড়ির বাসিন্দা নজরুল ইসলাম।
সাবেক সেনা সদস্য ইসলাম বেশ কয়েক মাস আগে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানান তার পরিবারের সদস্যরা।
ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী আইরিন আক্তার বলেন, ‘ফোন দিয়ে হাউমাউ করে কাঁনতেছে আর বলতেছে, আমারে ক্ষমা করে দিও। চারটে জান্নাত (সন্তান) তোমার কাছে রেখে আসছি। তুমি ওই চারটে জান্নাত দেখে রাইখো। পরে সেও আমার কাছে ক্ষমা চাইলো, আমিও তার কাছে ক্ষমা চাইলাম।’
আইরিন বরেন, ‘তখন বললো যে, যদি পনেরদিন-একমাস দেখো যে, আমার সাথে যোগাযোগ নেই, ভেবে নিও আমি মারা গেছি।’
স্বামীর সঙ্গে এটাই ছিল আইরিন আক্তারের শেষ কথা। আইরিন জানান, ভালো বেতনে হাসপাতালে নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার স্বামীকে রাশিয়ায় নিয়ে যায় দালালদের একটি চক্র। এরপর চাপ প্রয়োগ করে ইসলামকে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী।
তিনি জানান, ‘ওদের আটকায় রেখে প্রাণনাশের হুমকি দেয় যে, যদি আপনারা আজকে এই কাগজপত্রে সই না করেন, রাশিয়ান যে কাগজে, যদি সই না করেন, তাহলে আপনাদের মেরে ফেলে দেওয়া হবে, এমনকি আপনাদের লাশটাও দেশের মানুষ খোঁজ পাবে না।’
আইরিন আরো বলেন, ‘পরে উনি আমারে এগুলো বলে হাউমাউ করে কাঁনতেছে যে, আমি কী করলাম! তোমার কথাও শুনলাম না। তুমি যা যা বলছো, আজ তাই তাই হচ্ছে। আজ তোমার কথা শুনলে আমি হয়তো প্রাণে বেঁচে থাকতাম, ছেলে-মেয়ে নিয়ে ডাল-ভাত খাইতে পারতাম।’
‘এভাবে প্রতারণা করবে, বুঝতে পারি’
নজরুল ইসলামের মৃত্যুর খবর স্ত্রী-সন্তানরা জানতে পারেন তার সহযোদ্ধা ইকবাল হোসেনের মাধ্যমে।
ফার্নিচার কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে হোসেনকেও যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
ইকবাল হোসেনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আগে জানলে কখনোই আমরা তাকে যাইতে দিতাম না। আমি এজেন্সিকে বারবার বলেছি যে, আপনারা এখনও সত্য কথা বলেন, প্রয়োজনে আমি টাকা ফেরত নিবো না। যদি যুদ্ধে পাঠানো হয়, তাহলে আমি উনাকে দিবো না। কিন্তু উনারা বলেছে, কোনোভাবেই যুদ্ধ পাঠানো হবে না। বলছে, যুদ্ধ তো অনেক দূর, নিতেছি ফার্নিচার কোম্পানির কাজের জন্য। যুদ্ধে পাঠানো হইবো নাকি!’।
হোসেন বর্তমানে ইউক্রেনে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করছেন। প্রায় মাসখানেক ধরে তার কোনো খোঁজ পাচ্ছিলো না পরিবারের সদস্যরা। পরে জানা যায় যে, তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘পুরোটা ফ্যামিলির ভিতর একমাত্র উপার্জনকারী আমার স্বামী। তো উনার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে রাস্তায় বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই আমাদের। আমার একটা বাচ্চা। আমার বিয়ে হইছে একটা বছর হইলো মাত্র।’
মধ্যপ্রাচ্য হয়ে রাশিয়া
অনুসন্ধানে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে যে, বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগিদেরকে প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো একটি দেশে নেওয়া হচ্ছে। এরপর সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রাশিয়ায়।
রাশিয়া পৌঁছানোর পর ফাঁদে ফেলে চক্রের সদস্যরা কীভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদানে বাধ্য করেন, বিবিসি বাংলা'র কাছে সেটার বর্ণনা দিয়েছেন এক ভুক্তভোগি। তিনিও বর্তমানে রুশ বাহিনীতে কর্মরত থাকায় নিরাপত্তার কথা ভেবে নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।
দালালের খপ্পরে পড়ে রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধে যোগ দেওয়া ওই বাংলাদেশি বলেন, ‘ওইখানে আমাদেরকে মনে করেন একপ্রকার জোর-জবরদস্তি করেই কন্টাক্টটা সাইন করায় ওরা আমাদের। আমাদের পাসপোর্টগুলা তাদের কাছে ছিল। আমরা ফেরত চাইছি অনেকবার, কিন্তু তারা ফেরত দেয় নাই। না দিয়ে একপ্রকারের ব্ল্যাকমেইল করে আমাদের দিয়ে এই কন্টাক্টটা সাইন করানো হইছে।’
চুক্তিপত্রটি ছিল রুশ ভাষায়। ফলে স্বাক্ষর করার আগে বাংলাদেশি এসব নাগরিকরা জানতেন না, সেখানে ঠিক কী লেখা আছে।
রুশ সেনাদের হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া ওই প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, ‘আমরা তো রুশ ভাষা জানি না। আমাদের শুধু বলছে, সিগনেচার করতে, আমরা সিগনেচার করছি। সিগনেচার না করলে তো আমরা এখান থেকে বের হতেও পারতেছি না। আমাদের প্ল্যান ছিল, আমরা এখানে সিগনেচার করবো, তারপর ফিল্ডে যাবো। সেখান থেকে পলাই-টলাই হয়তো বের হওয়া যাবে। কিন্তু সেটা তো পারি নাই।’
রুশ ভাষায় লেখা যে কাগজে দালালরা জোর করে সই করতে বাধ্য করেছে, সেটির একাধিক কপি বিবিসি বাংলার হাতে এসেছে। যাচাই করে বিবিসি বাংলা দেখেছে যে, কাগজটি আসলে রুশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে যোগদানের আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্র। একবছর মেয়াদী ওই চুক্তিপত্রে রাশিয়ার সরকারি সিল এবং রুশ সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বাক্ষরও রয়েছে।
বেতনের অর্থও হাতিয়ে নিচ্ছে দালালরা
বিবিসি জানতে পেরেছে, এই চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিটি ব্যক্তির ব্যাংক হিসেবে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ দেয় রুশ সরকার। এর বাইরে, প্রতিমাসে বেতনও দেওয়া হয়। কিন্তু এসব অর্থেরও বেশিরভাগ অংশ তুলে নিচ্ছে দালাল চক্রের সদস্যরা।
ইউক্রেনে যুদ্ধে যেতে বাধ্য হওয়া প্রবাসী ওই বাংলাদেশি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমাদের কন্টাক্ট সাইন (চুক্তি স্বাক্ষর) করা বাবদ বিশ লাখ রুবল দিয়েছে রাশিয়ার সরকার। কিন্তু আমাদের দেওয়া হইছে, আট লাখ রুবল, আর বাকিটা ওরা খাইছে। এমনকি আমরা যদি মারা যায়, বা যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহলেও রুশ সরকারের দেওয়া অর্থ বা সম্পদ তারা পাবে- এভাবে করে আমাদের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করে কাগজপত্রে সই করে নিছে ওরা। জোর করে নিছে।’
এমনকি যুদ্ধে পাঠানোর পর সেখান থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও চক্রটি অনেকের কাছ থেকে কয়েক লাখ করে টাকা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগিদের পরিবার।
যাদের কাছ থেকে এভাবে টাকা নেওয়া হয়েছে, তেমনই একজন সাহিদ মোস্তফা তাঈন। যদিও শেষপর্যন্ত কথা রাখেনি দালাল চক্রের সদস্যরা।
সাহিদ মোস্তফা তাঈনের বড় বোন লোপা মোস্তফা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘জসিম সাহেব বলে, তাইন তুমি ওখানে তিন লাখ রুবল দাও, তাহলে তোমাকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে এনে একটা সেফ জোনে রাখবো। ও সাথে সাথে টাকা দিয়ে দিছে। একসঙ্গে এতটাকা তুলতে গিয়ে ওর কার্ডও আটকে গেছে ।’
চোখে ঘুম নেই স্বজনদের
সম্মুখসারিতে যুদ্ধে যাওয়া তাঈনের চার মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার দুশ্চিতায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধ মা। চোখে ঘুম নেই পরিবারের অন্য সদস্যদের।
সাহিদ মোস্তফা তাঈনের বড় বোন লোপা মোস্তফা বলেন, ‘আমার ভাই যুদ্ধে গেছে শোনার সাথে সাথেই আমার মায়ের একটা স্ট্রোক হয়, ব্রেন স্ট্রোক। ওই ঘটনার পর থেকে সে কিছুই মনে রাখতে পারে না।’
তাঈনের জন্য কান্নাকাটি করায় মায়ের শারীরিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মোস্তফা বলেন, ‘একদিন আমি রাতের বেলা উঠে দেখি জায়নামাজে বসে সে চিৎকার দিয়ে কাঁদতেছে। আরেকদিন দেখি মাগরিবের টাইমে। বাসায় কেউ নাই, সবাই বাইরে গেছে আর আমি আমার রুমে। তখনও দেখি সে কান্না করছে।’
এদিকে, বেশ কয়েক মাস স্বামীর খোঁজ না পাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তাঈনের স্ত্রী। ছোট দু'টো বাচ্চাকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন, ভেবে পাচ্ছেন না তিনি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা