হোম > বিশ্ব

খনিজ সম্পদ উত্তলনে পাকিস্তানের উচ্চাভিলাষ, বাধা বিচ্ছিন্নতাদী তৎপরতা

আমার দেশ অনলাইন

ছবি: সংগৃহীত

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ওভাল অফিসে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খনিজ ও রত্নে ভরা একটি কাঠের বাক্স উপহার দেন। এটি ছিল পাকিস্তানে মার্কিন কোম্পানিগুলোর লাভজনক চুক্তির প্রতি একটি ইঙ্গিত। যদিও পাকিস্তানের খনিশিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চীনের আধিপত্য রয়েছে।

এর কয়েক মাস পর ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়, যেখানে স্বর্ণ ও তামার বিশাল ভান্ডার রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ দমন ও ক্রিপ্টো খাতে অংশীদারিত্বের পর পাকিস্তানি কর্মকর্তারা খনিশিল্পে সহযোগিতার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে আকৃষ্ট করতে সফল হয়েছেন।

কিন্তু পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বিদ্রোহী গ্রুপ বেলুচ লিবারেশন আর্মি বা বিএলএর তৎপরতার কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

একটি স্বাধীন বেলুচিস্তানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে বিএলএ। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলায় ইন্ধন জুগিয়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি সবচেয়ে মারাত্মক হামলা চালায় তারা। এটি ছিল ৫০০ বিদ্রোহীর একটি সমন্বিত হামলা। ১২টি পৃথক এলাকার অন্তত ১৮টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় তারা। এতে অন্তত ৫৮ জন নিহত হন।

এই হামলাগুলোকে গুরুত্বহীন বলছেন পাকিস্তানি কর্মকর্তারা। কিন্তু দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, এটি ছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারের হামলা। শুধু সামরিক ও পুলিশ বাহিনীই নয়, একাধিক বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা হয়। এই হামলা পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি গোষ্ঠীটির চ্যালেঞ্জকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

দক্ষিণ এশীয় সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিশেষজ্ঞ আব্দুল বাসিত বলেন, ‘এ ধরনের হামলার জন্য কোনো না কোনোভাবে জনসমর্থন, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন হয়। এই উপাদানগুলো ছাড়া দিনের আলোয় এমন হামলা চালানো সম্ভব নয়।’

এই হামলাগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি বেলুচিস্তানের বৃহত্তম খনি এলাকা রেকো ডিকয়ের দিকে যাওয়ার রাস্তায় চালানো হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অব্যবহৃত তামা ও সোনার ভান্ডার। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিরল খনিবিষয়ক প্রধান বিশেষজ্ঞ গ্রেসলিন বাসকারানের মতে, ‘বিএলএ কোনো গৌণ চ্যালেঞ্জ নয়। এটি একটি প্রাথমিক, প্রকল্পনির্ধারক ঝুঁকি।’

প্রতিবেশী ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন যে, ইরানের পূর্বে কোনো ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে বিএলএর মতো গোষ্ঠীগুলো তাদের সদস্য সংখ্যা বাড়াতে, অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে আরো অবাধে চলাচল করতে এবং খনিজ সম্পদ ও সরঞ্জাম বহনকারী কনভয়ে হামলা চালাতে পারবে।

অন্য দুটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (পাকিস্তানি তালেবান) এবং ইসলামিক স্টেটের আঞ্চলিক শাখা—বেলুচিস্তানে তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে।

ভোরের হামলা

বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটা একটি উঁচু মরুপ্রান্তরের সীমান্ত থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, যার রাস্তাঘাট ও চেকপয়েন্টগুলো পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীতে পরিপূর্ণ।

গত ৩১ জানুয়ারি ভোরবেলা ৫০০ জনেরও বেশি বিএলএ বিদ্রোহী শহরটিতে এবং বেলুচিস্তানজুড়ে অন্তত ১২টি এলাকায় হামলা চালায়। এতে ৩৬ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ২২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হন।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলা চলাকালীন ও তার পরে তারা ২১৬ জন জঙ্গিকে হত্যা করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হওয়া এই সমন্বিত হামলাগুলো বিএলএর ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতাকেই তুলে ধরেছে। সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও অনুযায়ী, অন্তত দুটি স্থানে হামলার পর বিদ্রোহীরা স্থানীয় বাসিন্দারা জঙ্গিদের সাথে মিশে গিয়েছিল।

একসময় উপজাতীয় নেতাদের দ্বারা পরিচালিত বেলুচ বিদ্রোহ এখন একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণ ও শিক্ষিত বেলুচদের সমর্থন পাচ্ছে।

ইসলামাবাদে অবস্থিত গবেষণা কেন্দ্র পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের তথ্যমতে, ২০২১ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা এবং এর ফলে হতাহতের সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে।

বিএলএ এবং অন্যান্য বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মীদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ এবং বেসামরিক নাগরিকদের, বিশেষ করে চীনাদেরও লক্ষ্যবস্তু করেছে।

গভীরতর ক্ষোভ:

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের মধ্যে বৃহত্তম এবং এটি দেশটির সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশও।

পাকিস্তানের স্বাধীনতার এক বছর পর, ১৯৪৮ সালে বেলুচ বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়, যখন নবগঠিত রাষ্ট্রটি স্বশাসনের দাবি সত্ত্বেও বেলুচিস্তানকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। সেই থেকে সার্বভৌমত্ব হারানোর অনুভূতিই এই বিদ্রোহকে ইন্ধন জুগিয়ে আসছে। কোনো কোনো বেলুচ পাকিস্তানের কাছ থেকে বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়েছে, অন্যদিকে অন্যরা প্রতিবেশী ইরান ও আফগানিস্তানের বেলুচ অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করে একটি পৃথক বেলুচিস্তান গঠনের জন্য লড়াই করেছে।

বেলুচ জনগণ দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি অভিজাত শ্রেণি এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে এই অঞ্চলের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য অভিযুক্ত করে আসছে।

প্রদেশটির চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি আখতার কাকার বলেন, ‘বেলুচিস্তান খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ, কিন্তু বেলুচিস্তানের মানুষ জানে না সেই খনিজগুলো কোথায় যাচ্ছে।’

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বেলুচ বিদ্রোহীরা তাদের হামলা তীব্রতর করায় পাকিস্তান সরকারও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। সশস্ত্র বেলুচ গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধেও দমনপীড়ন চালানো হচ্ছে। এই দমনপীড়ন ব্যাপকতর ক্ষোভের অনুভূতিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

বেলুচিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আব্দুল মালিক বেলুচ বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সরকার শান্ত করার চেষ্টা না করে বরং উস্কানি দিচ্ছে।’

লোভনীয় সম্পদ

কোয়েটা থেকে সড়কপথে ৩৫০ মাইল দূরে, আফগান ও ইরান সীমান্তের কাছে অবস্থিত রেকো ডিক খনিতে আনুমানিক এক কোটি ৩০ লাখ টন তামা এবং এক কোটি ৭০ লাখ আউন্স স্বর্ণ রয়েছে। চার দশক ধরে উত্তোলনের মাধ্যমে এটি থেকে ৭ হাজার কোটি ডলার মুনাফা হতে পারে। এটি এখন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত লোভনীয় প্রকল্প।

মার্কিন দূতাবাস রেকো ডিকে মোট দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং সাত হাজার ৫০০ স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিনিয়োগ ঘোষণার কয়েক মাস আগে ট্রাম্প প্রশাসন বিএলএকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। নিরাপত্তা পরামর্শক ফাহাদ নাবিল বলেন, তখন থেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

তবুও, বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে জঙ্গি হামলার কারণে মার্কিন-পাকিস্তানি উদ্যোগ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

দক্ষিণ এশীয় সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ বাসিত বলেন, ‘পাকিস্তান একটি পুনরুজ্জীবিত বেলুচ বিদ্রোহের ভার বহন করতে পারবে না।’ তিনি আরো বলেন, ইরানে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিদেশি প্রকল্পগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য থামিয়ে দিতে পারে।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

আরএ

গাজাগামী ত্রাণবাহী নৌবহর থেকে আটক দুই কর্মীকে আদালতে তুলছে ইসরাইল

কোনো শক্তিই ইরানিদের সংকল্পকে দুর্বল করতে পারবে না: আইআরজিসি

চিকিৎসা সংকট যেভাবে কবিরাজের কাছে যেতে বাধ্য করছে আফগানদের

সিরিয়ায় জর্ডানের বিমান হামলা

সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রকে সময় বেঁধে দিল ইরান

ভ্যাটিকান সফরে যাচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও

ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় এখন যুদ্ধ জাদুঘর

বিক্ষোভে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে ইরানে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

যুদ্ধের সুযোগে সোমালিয়া উপকূলে ফের জলদস্যু আতঙ্ক

সাইবার অপরাধের মার্কিন অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ অপবাদ: উত্তর কোরিয়া