যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আবারও দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সাবেক পরিচালক জেমস কোমির বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনেছে। জাতীয় প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত তথ্য বেআইনিভাবে প্রকাশের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ট্রাম্পের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত কোমির বিরুদ্ধে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিল তার প্রশাসন। তবে নতুন এই মামলায় এখনো তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। কোমি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সোমবার প্রকাশ্যে আসা আদালতের সিলমোহরযুক্ত নথিতে নতুন অভিযোগের বিষয়টি জানা যায়। গত অক্টোবর মাসে আদালতে জমা দেওয়া এক নথিতে কৌঁসুলিরা অভিযোগ করেন, সংবাদমাধ্যমে তথ্য ফাঁস করতে এফবিআইয়ের সহকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন কোমি।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, কোমি এক বা একাধিক সহযোগীর মাধ্যমে একজন ব্যক্তিকে একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদকের কাছে জাতীয় প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাবস্ট্যাকে প্রকাশিত এক ভিডিওতে নতুন অভিযোগের জবাব দিয়েছেন কোমি। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলে উল্লেখ করেছেন।
কোমি বলেন, ‘তারা আবার ফিরে এসেছে। বিচার বিভাগের এমন ভয়াবহ অপব্যবহার না হলে বিষয়টি প্রায় হাস্যকর মনে হতো। কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের কখনোই অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া চলবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার কিছুই বদলায়নি। আমি এখনো নির্দোষ এবং এসব লোককে এখনো ভয় পাই না। আমি এখনো বিশ্বাস করি, ফেডারেল বিচারব্যবস্থা স্বাধীন।’
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এখনো অর্ধেক সময় বাকি রয়েছে উল্লেখ করে কোমি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ আনা হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক বছর আমাদের সবার জন্য কঠিন হবে। আমাদের দৃঢ় থাকতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ধরে রাখতে হবে।’
২০১৬ সালের একটি প্রতিবেদন ঘিরে অভিযোগ
নতুন অভিযোগের সূত্র ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস-এর একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছিল, ইয়াহুর ইমেইল প্ল্যাটফর্মে একটি নির্দিষ্ট কম্পিউটার-সংকেতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য খুঁজতে ওই সাইটের তথ্যপ্রবাহ স্ক্যান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই সংকেতের সঙ্গে একটি ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনের যোগসূত্র থাকার অভিযোগ ছিল।
প্রতিবেদনটির সাংবাদিক চার্লি স্যাভেজের কাছে স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশের নির্দেশ কোমি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন কৌঁসুলিরা।
কোমির আইনজীবী প্যাট ফিটজেরাল্ড সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে নতুন অভিযোগকে দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। তার ভাষ্য, সরকার এর আগে একই ঘটনা দুবার তদন্ত করেছে। কিন্তু দুইবারই কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ না আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
ফিটজেরাল্ড বলেন, এবারও কৌঁসুলিরা গ্র্যান্ড জুরির কাছে অভিযোগ উপস্থাপন করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিলের চেষ্টা করেননি। এর বদলে তারা ‘ক্রিমিনাল ইনফরমেশন’ নামের একটি আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগ আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ পদ্ধতিতে গ্র্যান্ড জুরির অনুমোদন ছাড়াই কৌঁসুলিরা অভিযোগ দাখিল করতে পারেন।
আইনজীবী বলেন, ‘প্রতিবেদনটি প্রকাশের ১০ বছর পর সরকার কোমির বিরুদ্ধে একটি “ইনফরমেশন” দাখিল করেছে। এটি কোনো বিচারকের অনুমোদন পায়নি, গ্র্যান্ড জুরিও জারি করেনি। এতে এমন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, যা কোমি করেননি।’
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির ফেডারেল আদালতের বিচারক ট্রেভর ম্যাকফ্যাডেন মামলাটি তদারক করছেন। তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ সালে এফবিআইয়ের পরিচালকের পদ থেকে কোমিকে বরখাস্ত করেন তিনি। এর আগে ২০১৩ সাল থেকে এফবিআইয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন কোমি।
কোমিকে বরখাস্ত করার সময় এফবিআই ট্রাম্পের ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারশিবিরের সঙ্গে রাশিয়ার যোগসাজশ ছিল কি না, তা তদন্ত করছিল। ট্রাম্প বারবার ওই তদন্তকে ‘প্রতারণা’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
২০২৫ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন তার সমালোচকদের বিরুদ্ধে একাধিকবার ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের মধ্যে কোমিও রয়েছেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে কোমি ও তার অন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ডিকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘কোমি, অ্যাডাম “শিফটি” শিফ, লেটিসিয়ার কী হলো? তারা সবাই ভয়াবহ অপরাধে দোষী, অথচ কিছুই করা হচ্ছে না।’
এখানে তিনি সাবেক এফবিআই পরিচালক কোমি, ডেমোক্রেটিক সিনেটর অ্যাডাম শিফ এবং নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের কথা উল্লেখ করেন। পোস্টে ট্রাম্প বন্ডিকে আর দেরি না করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, ‘এখনই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
এর পাঁচ দিন পর, ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কোমির বিরুদ্ধে কংগ্রেসে মিথ্যা বলা এবং আইনসভা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। তবে মামলার দায়িত্বে থাকা কৌঁসুলি লিন্ডসে হ্যালিগানকে বেআইনিভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল—এই যুক্তিতে পরে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ঘিরে দ্বিতীয় মামলা
এরপর ২৮ এপ্রিল কোমির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফায় অভিযোগ আনে ট্রাম্প প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝিনুকের খোলস দিয়ে ‘৮৬ ৪৭’ বার্তা সাজিয়ে একটি ছবি প্রকাশ করেছিলেন কোমি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্টকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
এখানে ‘৪৭’ বলতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘৮৬’ শব্দটি ইংরেজিতে ‘নাকচ করা’ বা ‘বাদ দেওয়া’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। খাবার পরিবেশন খাতে কোনো খাবার বা গ্রাহককে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ বোঝাতেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ‘৮৬’ শব্দটি সহিংসতার ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয় মামলাটি এখনো চলমান।
কোমির মেয়ের চাকরিচ্যুতি বেআইনি ঘোষণা
সোমবার কোমির বিরুদ্ধে তৃতীয় দফা অভিযোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার আগেই পৃথক একটি মামলায় তার মেয়ে মরিন কোমিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত বেআইনি ঘোষণা করেন এক ফেডারেল বিচারক।
মরিন কোমি সাবেক সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে গত বছর তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তিনি দাবি করে আসছেন, তার বাবার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের কারণে তাকে প্রতিশোধমূলকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
আদালত তাকে আগের পদে পুনর্বহাল এবং বকেয়া বেতন দেওয়ার অধিকারী বলে রায় দিয়েছেন।
জেমস কোমি তার বিরুদ্ধে আনা সব ফৌজদারি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সর্বশেষ অভিযোগগুলো খারিজ করার জন্যও তার আইনজীবীরা আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
এএম