যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন অফিসারদের গুলিতে দ্বিতীয় দফায় একজন মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনার পর ওই এলাকায় প্রশাসন `উত্তেজনা খানিকটা কমাতে যাচ্ছে’ বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মঙ্গলবার ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সবশেষ কথা, এটা ভয়াবহ ছিল। দুটি ঘটনাই ভয়াবহ ছিল।’
জানুয়ারির শুরুতে একজন অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে নিহত হন রেনি গুড নামের একজন নাগরিক। এরপর অ্যালেক্স প্রেটি, যিনি গত সপ্তাহের শেষ দিকে আইসিই কর্মীরা আটক করার সময় একজন অফিসারের গুলিতে নিহত হন।
প্রেটির মৃত্যুর পর স্থানীয়রা আবারও বিক্ষোভ শুরু করে এবং দেশজুড়ে এই জনরোষ ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় উভয় দলের আইন প্রণেতাদের সমালোচনার মুখে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন।
অবশ্য, ট্রাম্পের করা সবশেষ এই মন্তব্য মিনেসোটায় চলমান কার্যক্রম থেকে তার প্রশাসনের পিছিয়ে আসার লক্ষণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বা ডিএইচএস, মিনেসোটা মিশনের প্রধান এবং মুখ্য ব্যক্তিত্ব, সীমান্ত টহল কর্মকর্তা গ্রেগরি বোভিনোকে, সোমবার তার কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করেছে।
ডিএইচএস জানিয়েছে যে, তারা হোয়াইট হাউসের সীমান্ত জার টম হোমানকে সেখানে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মোতায়েন করছে এবং হোমান এই সপ্তাহে স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করবেন।
হোমান মঙ্গলবার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন যে তিনি মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ, মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করেছেন।
মঙ্গলবার রাতে আইওয়াতে এক সমাবেশের আগে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, সাবেক সৈনিকদের একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা নার্স হিসেবে কর্মরত প্রেত্তির হত্যাকাণ্ডকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’ হিসেবেই দেখেছেন তিনি।
প্রেটিকে ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করার সাথে তিনি একমত কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটা শুনিনি।’
ট্রাম্প এরপর যোগ করেন, ‘তার বন্দুক বহন করা উচিত হয়নি।’
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম জানিয়েছেন যে, সংঘর্ষের সময় একটি বন্দুক ‘তাক করে’ ছিলেন বলেই প্রেটিকে গুলি করা হয়েছে।
যদিও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে বন্দুকটি আইনত নিবন্ধিত ছিল এবং আগ্নেয়াস্ত্রটি সরিয়ে নেওয়ার পরে প্রেটিকে গুলি করা হয়েছিল।
ডিএইচএস আরো বলেছে যে প্রেটি তাকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা প্রতিহত করার পর এজেন্টরা আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালায়।
তবে প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় কর্মকর্তারা সেই বিবরণকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, তার হাতে অস্ত্র নয়, ফোন ছিল।
‘শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার জন্য তিনি সেখানে ছিলেন না, সহিংসতার করার জন্যই সেখানে ছিলেন,’ গুলি চালানোর পরপরই প্রেটিকে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ বলে অভিযুক্ত করে এই মন্তব্য করেন ক্রিস্টি নোয়াম।
প্রাণঘাতী হামলায় ৩৭ বছর বয়সী রেনি গুডের মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পর প্রেত্তির মৃত্যু স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এই অঞ্চল থেকে তার তিন হাজার অভিবাসন এজেন্ট এবং কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের জন্য নতুন করে আহ্বান জানান রাজ্য ও শহরের কর্মকর্তারা।
ফক্স নিউজের সাথে সাক্ষাৎকারে, ট্রাম্প মিনেসোটা অভিযানের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা হাজার হাজার নিষ্ঠুর অপরাধীকে রাজ্য থেকে বের করে এনেছি’, ‘তাই সেখানে অপরাধের সংখ্যা ভালো কমেছে।’
প্রশাসন "উত্তেজনা কমাতে কাজ করছে" জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, "সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে, আমাদের কাছে এখন টম হোমান আছে," তিনি বলেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধ বাসিন্দাদের বহিষ্কার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হোয়াইট হাউসের একজন শীর্ষ সহযোগী স্টিফেন মিলার সিএনএনকে বলেন, হোয়াইট হাউস ‘ডিএইচএসকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে মিনেসোটায় বিক্ষোভ ঠেকাতে যে অতিরিক্ত কর্মী বাহিনী পাঠানো হয়েছিল, তাদেরকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে আটক করার কাজে নিয়োজিত বাহিনী আর বিক্ষোভকারীদের মাঝে একটি ঢাল হিসাবে কাজ করতে পারে।'’
মিলার সিএনএনকে দেওয়া তার বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা এখন যাচাই করে দেখছি যে যে, কেন (মার্কিন কাস্টমস এবং সীমান্ত টহল) দল সেই প্রোটোকল অনুসরণ করছে না।’
প্রেটির মৃত্যুর তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা এবং আইনপ্রণেতা, যার মধ্যে রয়েছেন ভারমন্টের গভর্নর ফিল স্কট এবং নেব্রাস্কার মার্কিন সিনেটর পিট রিকেটস।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ রিকেটস লিখেছেন, ‘গেল সপ্তাহের শেষে জাতি এক ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে।’
যদিও তিনি ‘আইসিই-এর তহবিলের প্রতি তার সমর্থন একই থাকবে’ বলে পুনর্ব্যক্ত করে, রিকেটস বলেছেন যে তিনি ‘এই ঘটনার একটি অগ্রাধিকারমূলক, স্বচ্ছ তদন্ত’ আশা করছেন।
এই ঘটনার প্রমাণ ধ্বংস বা পরিবর্তন করতে ডিএইচএসকে নিষেধ করেছেন একজন ফেডারেল বিচারক।
মঙ্গলবার রাতে আইওয়া সমাবেশে অর্থনৈতিক নীতিমালার উপর দেওয়া এক বক্তৃতায়, মিনেসোটার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেননি ট্রাম্প। বরং তিনি তার অভিবাসন দমনের বিষয়টি আরো বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করেছেন।
ডিসেম্বরে হার্ভার্ড হ্যারিসের একটি জরিপের উদ্ধৃতিও দেন ট্রাম্প। যেখানে বলা হয়েছে যে, অপরাধে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়িত করার জন্য, ৮০ শতাংশ আমেরিকান তার প্রশাসনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা