যুক্তরাষ্ট্রে জেনারেশন জেড বা জেন জি প্রজন্মের তরুণদের কাছে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা ও সম্পদ গড়ার ধারণা বদলে যাচ্ছে। একসময় বাড়ি কেনাকে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ তৈরির অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে দেখা হলেও বাড়ির দাম ও ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় তরুণদের অনেকেই এখন অবসরকালীন সঞ্চয়, শেয়ারবাজার ও উচ্চ সুদের সঞ্চয় হিসাবে অর্থ রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
২০২০ সালে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগ্রহী হন ২৬ বছর বয়সী কানা কামিংস। তখন তিনি কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। করোনাভাইরাস মহামারির সময় উদ্বেগ কমাতে কয়েকজন শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করলে তিনি সেখানে অংশ নেন।
কর্মশালা শেষে গ্রীষ্মকালীন ইন্টার্নশিপ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে তিনি রথ আইআরএ নামের অবসরকালীন বিনিয়োগ হিসাব খোলেন। পরে ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পর কোম্পানির ৪০১(কে) পরিকল্পনায় অর্থ জমাতে শুরু করেন এবং বার্ষিক বোনাসের অর্থও রথ আইআরএতে রাখেন। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনের জন্য অর্থবাজারভিত্তিক তহবিলে সঞ্চয় এবং আলাদা একটি বিনিয়োগ পোর্টফোলিও গড়ে তুলেছেন।
ভবিষ্যতে বড় কোনো শহরে অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ইচ্ছা থাকলেও বর্তমানে বাড়ি কেনার জন্য আলাদা করে সঞ্চয় করছেন না কামিংস। ব্যবসায় শিক্ষার পড়াশোনা শুরু করার আগে তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন ব্যয় ও বন্ধকি ঋণের উচ্চ সুদহার তরুণদের জন্য বাড়ি কেনাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জুন মাসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৪০ বছরের কম বয়সী ৮৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেন, তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান তরুণদের জন্য বাড়ি কেনা বেশি কঠিন। একই জরিপে দেখা যায়, বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের মধ্যে বাড়িকে ‘খুব ভালো’ বিনিয়োগ হিসেবে দেখার প্রবণতাও কম।
ফলে জেন জির অনেকেই অবসরকালীন সঞ্চয়, বিনিয়োগ অ্যাপের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচা এবং উচ্চ সুদের সঞ্চয় হিসাবে অর্থ রাখাকে সম্পদ তৈরির কার্যকর পথ হিসেবে দেখছেন।
অবসরকালীন সঞ্চয়ও জেন জির অন্যতম বড় আর্থিক লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শুরুতে ফিডেলিটির এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জেন জির অবসরকালীন সঞ্চয়ে অবদান এক বছরে ৬৫ শতাংশ বেড়েছে, যা মিলেনিয়ালদের বৃদ্ধির হারের দ্বিগুণেরও বেশি।
স্ট্যানফোর্ডের গবেষক রোবার্টা ক্যাটজ, যিনি জেন জি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন, বলেন—এই প্রজন্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা। তার মতে, বয়স্ক প্রজন্মের কাছে বাড়ি ছিল সম্পদ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু জেন জির মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এমন স্থির ধারণা নেই। বরং তারা পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য আর্থিক নমনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
২৮ বছর বয়সী জেফ শার্পের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ওরেগনের বেন্ড শহরে বসবাসকারী শার্প বারটেন্ডার হিসেবে খণ্ডকালীন কাজের পাশাপাশি পাইলট হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ওই শহরে একটি বাড়ির মধ্যম দাম বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০ বছর আগের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি।
শার্প ২০ বছরের শুরুর দিকেই বিনিয়োগ শুরু করেন। প্রথমে রবিনহুড অ্যাপ ব্যবহার করে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কিনতেন। পরে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আরও জানার পর সূচকভিত্তিক তহবিলে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেন এবং রবিনহুডের সব বিনিয়োগ ভ্যানগার্ডে স্থানান্তর করেন। একই সঙ্গে রথ আইআরএ ও মেয়ের জন্য ৫২৯ কলেজ সঞ্চয় পরিকল্পনায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ক্ষুদ্র অঙ্কে বিনিয়োগের জন্য তিনি অ্যাকর্নস অ্যাপও ব্যবহার করেন।
জেন জির আর্থিক সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজেট ও বিনিয়োগের বিভিন্ন অ্যাপের ব্যবহারও বাড়ছে। চলতি মাসে প্রকাশিত গ্যালাপের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জেন জির ৮১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ খোঁজেন এবং ৭৫ শতাংশ এ ধরনের তথ্য অনলাইন থেকে সংগ্রহ করেন।
২৩ বছর বয়সী অ্যাডাম বেন্টন একটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিচালন বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। বেতন পাওয়ার পর তিনি নিয়মিতভাবে অবসরকালীন সঞ্চয়, ব্রোকারেজ হিসাব ও উচ্চ সুদের সঞ্চয় হিসাবে অর্থ সরিয়ে রাখেন। সূচকভিত্তিক তহবিলে বিনিয়োগের জন্য তিনি চার্লস শোয়াবের অ্যাপ ব্যবহার করেন। আর নিজের সম্পদের অগ্রগতি দেখতে ‘মাই ওয়ালেট’ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে নিট সম্পদের হিসাব রাখেন।
বেন্টনেরও একদিন বাড়ি কেনার ইচ্ছা আছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিকে নিকট ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন না তিনি। তার ভাষায়, বাড়ি কেনার বিষয়টি এত দূরের মনে হয় যে সেখানে পৌঁছানো আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন জাগে।
জেন জির এই পরিবর্তিত আর্থিক দৃষ্টিভঙ্গি মূলত বাড়ির ক্রমবর্ধমান মূল্য, উচ্চ ঋণব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে প্রচলিতভাবে ‘বাড়ি কিনে সম্পদ গড়া’র ধারণার বদলে এ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে বিনিয়োগ, অবসরকালীন সঞ্চয় এবং বিভিন্ন আর্থিক সম্পদে অর্থ ছড়িয়ে দিয়ে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা তৈরির পথ বেছে নিচ্ছে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
এআরবি