আফগানিস্তান থেকে ইরাক, লিবিয়া থেকে সিরিয়া, আর এখন ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত এক দীর্ঘ যুদ্ধ ও ইসলামভীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের পাতা ফাঁদে আটকে পড়েছে। নাইন-ইলেভেন-এর হামলা নিয়ে ইসরাইলি গোয়েন্দাদের আগাম জানাশোনার চাঞ্চল্যকর দাবি প্রমাণ করে, এ হামলার পেছনের প্রকৃত সত্য নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই, বরং তা সময়ে সময়ে নিচ্ছে নতুন মোড়।
ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ৯/১১ হামলা সংঘটিত হওয়ার আগেই এ সম্পর্কে জানত। ইসরাইলের নেতৃত্ব কখনোই ৯/১১ হামলা নিয়ে তাদের মনোভাব লুকায়নি; বরং তাদের ধারণা ছিল, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ককে আরো গভীর করে তুলেছে। ব্রিটিশ সাংবাদিক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও লেখক পিয়ার্স মরগানের অনুষ্ঠান ‘আনসেন্সরড নিউজ’-এ মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন একটি প্রামাণ্যচিত্র সিরিজে সম্প্রতি এসব দাবি করেছেন।
কার্লসন উল্লেখ করেন, হামলার পরপরই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন, ‘এ ঘটনা আসলে ভালো। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইসরাইল কয়েক দশক ধরে অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি ৯/১১ হামলার সঙ্গে পার্ল হারবারে জাপানি হামলার তুলনাও করেছিলেন। ট্রাম্পসহ বেশ কিছু পরিচিত মুখ ও গণমাধ্যম ভাষ্যকার মুসলিম এবং আরব মার্কিনদের নিয়ে ভয় উসকে দিয়ে নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠীকে আরো উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন।
কার্লসন এ প্রসঙ্গে বহুল আলোচিত ‘ইসরাইলি আর্ট স্টুডেন্টস’ ইস্যুও সামনে আনেন। তার কথায়, যুক্তরাষ্ট্রে এ তথাকথিত শিল্পশিক্ষার্থীদের কেউ কেউ প্রকৃতপক্ষে শিল্পশিক্ষার্থী ছিলেন না, বরং ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার করে কিছুদিন আটকে রাখা হলেও পরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়। এফবিআইয়ের নথি অনুযায়ী ওই শিক্ষার্থীদের কয়েকজন হামলার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন এবং দৃশ্যত হামলার বিষয়ে আগে থেকেই তাদের ধারণা ছিল।
অথচ হামলার ঠিক পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের জীবনে নেমে আসে নতুন সংকট। বহু মসজিদে আগুন দেওয়া হয় বা ভাঙচুর করা হয়, মুসলিমদের ওপর নেমে আসে হত্যার হুমকি ও হয়রানি। ২০১১ সালে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টারের সাক্ষ্য অনুযায়ী, শুধু মুসলিম বলে মনে হওয়ার কারণেই অনেককে মারধর, আক্রমণ এমনকি বন্দুকের মুখে ফেলা হয়েছিল।
মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ৯/১১ ও এর পরবর্তী বৈষম্য নিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হিসেবে তারাও (মুসলিমরা) সেদিন আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘এ দেশ, এ কমিউনিটি তাদেরও। হামলায় মুসলিম ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ বহু মুসলিম নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।’
মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (এফবিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধ বেড়ে যায় প্রায় ১৬১৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ইসলামভীতি থেকে সৃষ্ট ঘৃণামূলক অপরাধের অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যা এটি। এমন অপরাধের ঘটনা ২০০০ সালে ছিল ২৮টি। ২০০১ সালে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১টিতে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আরব আমেরিকান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক স্যালি হাওয়েল বলেন, ৯/১১ পরবর্তী সময়ে মুসলিম ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এতটাই ভয় তৈরি হয়েছিল যে সন্ত্রাস মোকাবিলার নামে নাগরিকদের ওপর নজরদারি, হয়রানি ও ফাঁদে ফেলার মতো নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালের নির্বাচনী মৌসুমেও মুসলিমবিরোধী মনোভাব অব্যাহত ছিল। সে সময় ইসলামভীতিজনিত ঘৃণামূলক অপরাধ আবার বেড়ে যায়। এফবিআইয়ের হিসাবে ২০০১ সালে এমন ঘটনা ঘটেছিল ৪৮১টি, যা পরের বছরই কমে দাঁড়ায় ১৫৫টিতে। এরপর ২০১৫ সালে তা আবার বেড়ে হয় ২৫৭, আর ২০১৬ সালে ৩০৭। অবশ্য, এর পর থেকে এ সংখ্যা ক্রমশ কমেছে।
সূত্র: এবিসি নিউজ ও সিবিএস