ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান এবং একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকায় যুক্ত করার পর আদালত যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং এই পদক্ষেপকে আদালতের স্বাধীনতার ওপর একটি ‘প্রকাশ্য আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছে।
বুধবার এক বিবৃতিতে আইসিসি জানায়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা একটি নিরপেক্ষ বিচারিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। আদালত সতর্ক করে বলেছে, বিচারক, কৌঁসুলি ও কর্মীদের লক্ষ্য করে নেওয়া এ ধরনের পদক্ষেপ ‘আইনের শাসনকে দুর্বল করে’।
ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে এবং আদালতের জ্যেষ্ঠ ট্রায়াল আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইসিসিকে একটি ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ও মারাত্মকভাবে রাজনীতিকীকৃত প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এ পদেক্ষেপ নেয়।
জাপানি বিচারক আকানে ২০২৪ সালের মার্চে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আইসিসি-র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অন্যদিকে সেয়ে সেনেগালের নাগরিক এবং আদালতের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
মার্কিন মিত্র ইসরাইলকে নিয়ে আদালতের তদন্তের প্রতিক্রিয়ায় আইসিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ওয়াশিংটনের এই সর্বশেষ পদক্ষেপটি এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বিরোধীতা করেছে জাপান ও ইইউর
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে জাপানও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস সেক্রেটারি তোশিহিরো কিতামুরা এক বিবৃতিতে বলেন, জাপান দীর্ঘদিন ধরে আইসিসিকে সমর্থন করে আসছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টায় আইসিসির পাশে রয়েছে টোকিও।
জাপান আইসিসির সবচেয়ে বড় অর্থদাতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
আকানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পৃথক দুটি বিবৃতিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেন, তারা আকানে ও আইসিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশে দৃঢ়ভাবে রয়েছেন। তাদের মতে, আইসিসির কর্মকর্তাদের ‘স্বাধীনভাবে এবং বাইরের কোনো চাপ ছাড়াই’ কাজ করতে সক্ষম হতে হবে।
কেন নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র?
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা ব্যক্তিরা এমন দেশগুলোর কর্মকর্তাদের তদন্ত, গ্রেপ্তার, আটক বা বিচারের আইসিসি প্রচেষ্টার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, যেসব দেশ আইসিসির এখতিয়ার মেনে নেয়নি।
আইসিসি মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এর জবাবে বলেছে, ‘যখন আইন প্রয়োগের জন্য বিচারিক কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া হয়, তখন স্বয়ং আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
তবে রুবিও তার বক্তব্যের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো উদাহরণ দেননি।
এর আগে ইসরাইলকে ঘিরে আইসিসির তদন্ত ও কার্যক্রমের জেরেও কয়েকজন আইসিসি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল ওয়াশিংটন।
২০২৪ সালে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ নিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। এরপর আদালটির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ আরও তীব্র হয়।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেন না এবং দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেনও করতে পারেন না।
আইসিসি থেকে সরে যেতে মিত্রদের আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের
এদিকে গত মাসে ওয়াশিংটন আইসিসির বিরুদ্ধে বড় ধরনের কূটনৈতিক প্রচার শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র আদালতটিকে মার্কিন নাগরিকদের জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে মিত্র দেশগুলোকে আইসিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।
ইতোমধ্যে চাদ ও ভেনেজুয়েলা আইসিসি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এসব প্রত্যাহারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত। আইসিসির মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র আইসিসি প্রতিষ্ঠাকারী রোম সংবিধানে স্বাক্ষর করলেও চুক্তিটি কখনো অনুমোদন করেনি। ইসরায়েল ও রাশিয়াও আইসিসি-র সদস্য নয়।
গত সপ্তাহে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ চারটি মানবাধিকার সংস্থা আইসিসি-কে লক্ষ্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের একটি আদালতে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপগুলো যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
২০২৩ সালে, ইউক্রেন যুদ্ধের ঘটনায় আইসিসি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, যার প্রতিক্রিয়ায় মস্কোও আকানেসহ আদালতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিজস্ব গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
সূত্র: এমএমআর
এমএমআর