কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ আরও তীব্র করার মধ্যে লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছে কানাডা।
উত্তর আমেরিকার দুই দেশের সীমান্তে অবস্থিত এই জলভাগের নাম পরিবর্তন করে কানাডাকে নিয়ে নিজের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আরও বাড়ালেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে তিনি একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন।
তবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তাৎক্ষণিক ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, হ্রদটির নাম সবসময়ই লেক অন্টারিও থাকবে।
দীর্ঘদিনের দুই মিত্র দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা গত সপ্তাহে শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ এলো। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একে অপরের পণ্যের ওপর পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করে।
হোয়াইট হাউসে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করার সময় ৮০ বছর বয়সী রিপাবলিকান ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘অবিলম্বে লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে লেক আমেরিকা করা হবে।’
এএফপির এক সাংবাদিক জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর বদলে কেন একটি মিত্র দেশের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নিচ্ছেন? জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘কানাডার কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করেছেন। তারা বাজে মানুষ।’
ওভাল অফিসে ট্রাম্পের ডেস্কের পেছনে দুটি মানচিত্র রাখা ছিল। একটিতে হ্রদটির ওপর লাল অক্ষরে ‘লেক আমেরিকা’ লেখা ছিল। অন্যটির শিরোনাম ছিল, ‘মেকিং দ্য গ্রেট লেকস ইভেন গ্রেটার’।
কানাডার পাল্টা জবাব
আয়তনের দিক থেকে লেক অন্টারিও পাঁচটি গ্রেট লেকের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এই হ্রদটি কানাডার অন্টারিও প্রদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত।
লেকটির নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেক্সিকো উপসাগরের নাম একতরফাভাবে ‘গালফ অব আমেরিকা’ করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের মতোই। ওই সিদ্ধান্তও মেক্সিকো প্রত্যাখ্যান করেছিল।
কার্নি পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, লেকটির নাম প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো— যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয় দেশ প্রতিষ্ঠারও আগের। নামটি একটি আদিবাসী শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘হ্রদটি সুন্দর, হ্রদটি বড়।’
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কার্নি বলেন, ‘আমরা জানি, আমেরিকা পরিবর্তিত হচ্ছে।’
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কার্নির কঠোর অবস্থান কানাডায় প্রশংসিত হয়েছে।
কানাডার সবচেয়ে বড় শহর টরন্টো লেকটির উত্তর-পশ্চিম তীরে অবস্থিত। সেখানে কানাডীয় ও মার্কিন নাগরিক—দুই দেশের মানুষই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
টরন্টোর পশ্চিমে কিচেনারে বসবাসকারী মার্ক উইকার বলেন, ‘এটাই ট্রাম্পের স্বভাব। তিনি একজন দাদাগিরি করা মানুষ, উসকানি দেন এবং বিরোধ বাধান।’
আলবার্টা প্রদেশ থেকে টরন্টোতে বেড়াতে আসা জেক মারচুক বলেন, ‘তিনি শুধু আমাদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’
নিউ জার্সির বাসিন্দা মেগান স্মিথ সরাসরি বলেন, ‘এতে তাকে শুধু বোকাই মনে হচ্ছে।’
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে মার্কিন স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারি ভৌগোলিক নামকরণ ব্যবস্থায় হ্রদটির নামের সব তথ্য পরিবর্তন করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সব দপ্তরকে হ্রদটির নাম ‘লেক আমেরিকা’ হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদেশে নাম পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, হ্রদটির সবচেয়ে গভীর অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অংশে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ‘হ্রদের পানির মোট আয়তনের বেশিরভাগের দাবি রাখে।’
ইরান যুদ্ধ ও দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার মধ্যে এবং নভেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তিনি বলেন, অনেক দিন ধরেই তিনি লেকটির নাম পরিবর্তনের কথা ভাবছিলেন।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী মহাসাগরগুলোর নামও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি উপসাগর আছে এবং একটি হ্রদ আছে। এখন আমাদের শুধু একটি মহাসাগর দরকার। তাই হয়তো আটলান্টিক অথবা প্রশান্ত মহাসাগরের নামও পরিবর্তন করতে হবে। হয়তো দুটোরই নাম বদলে দেব।’
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প তার বিভিন্ন অস্বাভাবিক ভূখণ্ডগত দাবির কারণে একের পর এক মিত্র দেশকে বিরক্ত করেছেন। এর মধ্যে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার দাবিও রয়েছে।
এছাড়া ন্যাটোর মিত্র ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ওপরও দাবি জানিয়েছেন ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য করার কথাও বলেছেন তিনি।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালীকেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার কথা বলেছেন ট্রাম্প। তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখনো চলমান থাকা সত্ত্বেও তিনি এমন দাবি করেছেন।