ইরান যুদ্ধ
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে ‘নিশ্চিত বিজয়ের’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, সেখানে পরিস্থিতি এখন এমন দিকে মোড় নিচ্ছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত বহন করছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ফোনালাপে ট্রাম্প জানান, ওয়াশিংটন বর্তমানে তেহরানের সঙ্গে একটি ‘লেটার অব ইন্টেন্ট’ বা সমঝোতা চিঠি নিয়ে আলোচনা করছে। সম্ভাব্য এই চুক্তির আওতায় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৩০ দিনের আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ থেকে ধীরে ধীরে সরে আসারই ইঙ্গিত। তাদের দাবি, ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। ফলে বড় ধরনের সামরিক জড়িত হওয়ার পরিবর্তে ট্রাম্প প্রশাসন এখন সীমিত প্রতীকী পদক্ষেপের মধ্যেই নিজেদের অবস্থান সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে।
সংকটের সূচনা হয় গত মার্চে, যখন ইসরাইল ইরানের পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান কাতারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস উৎপাদন স্থাপনায় আঘাত হানে। এরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের আহ্বান জানায় এবং সংঘাত ধীরে ধীরে স্থবির অবস্থায় পৌঁছে।
বিশ্লেষকদের দাবি, গত দুই মাস ধরে তেহরান নিশ্চিত ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের পথে যাবে না। এ কারণে টানা ৩৭ দিনের হামলা সত্ত্বেও ইরান কোনো বড় ধরনের ছাড় দেয়নি। বরং দেশটি যুদ্ধক্ষতিপূরণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সীমাবদ্ধতা না থাকা, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো কঠোর শর্ত সামনে এনেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির সময়কে কাজে লাগিয়ে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করছে। তেহরান বিভিন্ন তেল আমদানিকারক দেশের সঙ্গে পৃথক ট্রানজিট চুক্তি করছে এবং যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি নেই, তাদের জাহাজের ওপর অতিরিক্ত ফি আরোপ করছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্র রাষ্ট্রগুলো অগ্রাধিকার পাবে। একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর জন্যও আলাদা ট্রানজিট সুবিধা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিরোধী দেশগুলোর জাহাজ প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।
খবরে আরো বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও ইরাক ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী ট্রানজিট চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করবে না এটি স্পষ্ট হওয়ার পর আরো অনেক দেশ দ্রুত ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে ইরানের প্রভাব আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ট্রাম্প প্রশাসন এই সংকটের গুরুত্ব আড়াল করতে অন্য ইস্যু সামনে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যে কিউবা ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার শুরু করেছে।
এদিকে ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেৎজ এক মন্তব্য প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর প্রভাব আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পত্রিকাটির সামরিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদকের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির শর্তগুলো ইসরাইলের জন্য মোটেও অনুকূল নয়।
একজন মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক ফোনালাপের পর নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত উদ্বেগপূর্ণ। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরান আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অবস্থানে উঠে আসতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের কৌশলগত অবস্থান ও নিরাপত্তা বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: হারেৎজ
এআরবি