ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা সাম্প্রতিক চুক্তি দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি করেছে, আবার একই সঙ্গে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। এক নিবন্ধে লেখক মিরজানা পেরিচের মূল প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের মধ্যে হওয়া তেল চুক্তি কি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বিনিময়ে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্নকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে?
৩১ আগস্ট ঘোষিত চুক্তিটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এর প্রধান লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে চাপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ ওয়াশিংটনের কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চুক্তির আওতায় নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স বা এনএবিইপি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রমাণিত মজুদের সম্ভাবনা প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ আসতে পারে এবং উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন সরকার ওই যৌথ উদ্যোগে ৩৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিয়েছে।
চুক্তিটির সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো এর মেয়াদ। ওয়াশিংটনের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭টি তেলক্ষেত্রের অধিকার ১০০ বছরের জন্য দেওয়া হয়েছে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছর বলে দাবি করেছে। এই দুই বর্ণনার পার্থক্যই চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।
চুক্তির সমর্থকদের যুক্তি, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও অব্যবস্থাপনায় ভেঙে পড়া ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনর্গঠনে বিদেশি পুঁজি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা জরুরি। দেশটির তেল উৎপাদন ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ব্যাপকভাবে কমে গেছে। নতুন বিনিয়োগ এলে পরিশোধনাগার, পাইপলাইন ও উৎপাদন অবকাঠামো পুনর্গঠন সম্ভব হবে এবং এর মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথ খুলতে পারে।
কিন্তু সমালোচনার জায়গাটিও গুরুতর। অভিযোগ উঠেছে, এত বড় একটি জাতীয় সম্পদ-সম্পর্কিত চুক্তি যথেষ্ট স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করা হয়নি এবং ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকো রদ্রিগেজের মতো সমালোচকেরা মনে করেন, দেশটির সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্র বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট চুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।
তেল চুক্তির সঙ্গে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে নির্বাচন নিয়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। ওয়াশিংটন বলেছে, ভেনেজুয়েলায় শেষ পর্যন্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। রদ্রিগেজও কোনো নির্দিষ্ট তারিখ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন যদি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চেয়ে তেল উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে মাদুরো-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তরে না গিয়ে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর নতুন সংস্করণে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ সরকার বদলালেও প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার, স্বাধীন নির্বাচন ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য হলো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া গণতান্ত্রিক রূপান্তর টেকসই হবে না। ওয়াশিংটনের যুক্তি অনুযায়ী, প্রথমে অর্থনীতি ও তেলশিল্পকে পুনরুদ্ধার করতে হবে, এরপর এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে একটি কার্যকর নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্ভব হবে। মার্কিন কর্মকর্তারা তেল চুক্তিকে তাই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং তার পূর্বশর্ত হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
তবে ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিকদের একটি অংশ এই যুক্তি মানতে নারাজ। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো বলেছেন, তেলশিল্পে বিনিয়োগের জন্য একটি ‘গুরুতর ও গণতান্ত্রিক সরকার’ প্রয়োজন। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে ভেনেজুয়েলার পুরোনো রাজনৈতিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে তেল দেশটির অর্থনীতি যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান হাতিয়ারও হয়েছে। হুগো শাভেজ ও নিকোলাস মাদুরোর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল। ফলে তেলশিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক আসলে শুধু অর্থনীতির প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নও।
নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ তাই ভেনেজুয়েলার জন্য একদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এপি জানিয়েছে, কিছু ভেনেজুয়েলান মনে করছেন মার্কিন অংশীদারিত্ব অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে পারে; আবার অনেকে এটিকে জাতীয় সম্পদের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তেল কি গণতন্ত্রের পথ খুলবে, নাকি গণতন্ত্রের জায়গা দখল করবে? যদি নতুন বিনিয়োগ ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে, কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং একই সঙ্গে স্বাধীন নির্বাচন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক জবাবদিহির পথ তৈরি করে, তাহলে চুক্তিটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু যদি তেল উৎপাদন ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থই অগ্রাধিকার পায় এবং নির্বাচন অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের আড়ালে নতুন এক ক্ষমতাকাঠামো স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল একটি তেল চুক্তির গল্প নয়। এটি অর্থনীতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্যকার সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। শেষ পর্যন্ত চুক্তিটির সাফল্য শুধু কত ব্যারেল তেল উৎপাদন হলো তা দিয়ে মাপা হবে না; বরং ভেনেজুয়েলার জনগণ তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণের সুযোগ পেল কি না—সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।
সূত্র: ডেইলি সাবাহ, রয়টার্স, আল-জাজিরা, এপি নিউজ ও লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস