ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দাবি করেছেন, ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ নামে পরিচিত ওই সমঝোতা চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান।
শাহবাজ শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্ট ইলেকট্রনিকভাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। এই উদ্যোগে সহায়তার জন্য কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের নেতৃত্বকে ধন্যবাদও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। সমঝোতার ঘোষণার পর তেলের দাম কমেছে এবং বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
এদিকে, পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সফলতা ভারতের জন্যও একটি নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। দীর্ঘদিন ধরে ভারত পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল গ্রহণ করলেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা সহজ নয় বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রায় ২৪ কোটির বেশি জনসংখ্যা নিয়ে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। মুসলিম বিশ্বে এর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব পাকিস্তানকে একটি বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি প্রবাসীও দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
সামরিক শক্তির দিক থেকেও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বের বৃহৎ স্থায়ী সেনাবাহিনীগুলোর একটি পাকিস্তানের রয়েছে। দেশটি চীন ও তুরস্কের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছে এবং বিভিন্ন দেশে যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করছে।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের অবস্থানও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দেশটির হাতে প্রায় ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতাও পাকিস্তানের কৌশলগত প্রভাব বাড়িয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানও পাকিস্তানের অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারত, আফগানিস্তান, ইরান ও চীনের সঙ্গে স্থলসীমান্ত এবং আরব সাগরের তীরবর্তী অবস্থান দেশটিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র পাকিস্তান।
তবে এসব শক্তির পাশাপাশি দেশটি অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি। বেলুচিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকট পাকিস্তানের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং মিত্র দেশগুলোর আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতাও দেশটির দুর্বলতার অন্যতম দিক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তববাদী ও স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের গুরুত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতার দাবিও সেই কৌশলেরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা বা বিচ্ছিন্ন করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: এনডিটিভি
এআরবি