‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি?’ প্রবন্ধ প্রকাশের প্রায় চার দশক পরও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামাকে ঘিরে সেই বিতর্ক শেষ হয়নি। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত ওই প্রবন্ধ এবং পরে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত বই ‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান’-এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। তার নতুন স্মৃতিকথা ‘ইন দ্য রিয়ালম অব দ্য লাস্ট ম্যান’-এ নিজের চিন্তার বিকাশ, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফুকুয়ামা তার পুরোনো বক্তব্যের নানা ভুল ব্যাখ্যাও পরিষ্কার করেছেন।
ফুকুয়ামার ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ তত্ত্বকে প্রায়ই এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে তিনি মনে করেছিলেন, উদার গণতন্ত্র চূড়ান্তভাবে জয়ী হয়েছে এবং এরপর পৃথিবীতে বড় ধরনের আদর্শিক সংঘাতের আর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ফুকুয়ামা বলেন, তার বক্তব্য এতটা সরল ছিল না। তার মূল যুক্তি ছিল—উদার গণতন্ত্র মানুষের স্বাধীনতা ও সমতার আকাঙ্ক্ষা পূরণের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সন্তোষজনক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে গণতন্ত্র নিখুঁত বা বিশ্বের সব দেশ অনিবার্যভাবে একই পথে এগোবে।
তার এই চিন্তার পেছনে জার্মান দার্শনিক জি ডব্লিউ এফ হেগেল এবং রুশ-ফরাসি দার্শনিক আলেক্সান্দ্র কোজেভের ব্যাখ্যার প্রভাব ছিল। ফুকুয়ামার মতে, মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি বড় অংশ স্বাধীনতা, সমতা ও সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত। ফলে কোনো সমাজ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও মানুষ যদি সম্মান, মর্যাদা ও নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতি না পায়, তাহলে সেখানে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
এই জায়গা থেকেই ফুকুয়ামা বর্তমান রাজনীতিতে ট্রাম্পের উত্থানকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে শুধু অর্থনীতি, অভিবাসন বা দলীয় রাজনীতি কাজ করেনি; সমাজের একটি অংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ‘স্বীকৃতি পাওয়ার’ আকাঙ্ক্ষাও ভূমিকা রেখেছে। যারা মনে করেন তাদের জীবন, সংস্কৃতি বা সামাজিক মর্যাদা অন্যরা অবমূল্যায়ন করছে, তারা এমন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন, যে নেতৃত্ব তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষকে প্রকাশ করে।
তবে ফুকুয়ামা ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানকে উদার গণতন্ত্রের তত্ত্বের সরাসরি পরাজয় হিসেবে দেখছেন না। বরং তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, গণতন্ত্রের ভেতরেই এমন সংকট তৈরি হতে পারে, যেখানে নাগরিকদের একটি অংশ প্রচলিত প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়ে বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে। গণতন্ত্র টিকে থাকার জন্য শুধু নির্বাচন যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের মর্যাদা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষাৎকারে ফুকুয়ামা নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের কথাও বলেছেন। একসময় তিনি মার্কিন নব্য রক্ষণশীল রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং ইরাক যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, ৯/১১-এর পরবর্তী পরিস্থিতি এবং ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট তার চিন্তায় বড় পরিবর্তন আনে। বর্তমানে তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার ওপর আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেন।
ফুকুয়ামা বলেন, তার চিন্তার এই পরিবর্তনের সঙ্গে তার জাপানি-আমেরিকান পারিবারিক পরিচয়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই। বরং আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলির অভিজ্ঞতাই তার অবস্থান পরিবর্তনের প্রধান কারণ। তিনি পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং নাগরিকদের অধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেন।
চীনের উত্থান নিয়েও তার অবস্থান উল্লেখযোগ্য। ফুকুয়ামা স্বীকার করেন, যদি চীনের মতো উদার গণতন্ত্রবহির্ভূত কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে আরো স্থিতিশীল, সফল ও মানুষের জন্য বেশি সন্তোষজনক প্রমাণিত হয়, তাহলে উদার গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের তার পুরোনো ধারণা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ তিনি নিজের তত্ত্বকে অপরিবর্তনীয় সত্য হিসেবে দেখছেন না।
নতুন স্মৃতিকথায় ‘শেষ মানুষ’-এর ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফুকুয়ামার মতে, কোনো সমাজ যদি যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে মুক্তিও পায়, তবু মানুষের মধ্যে অর্থপূর্ণ জীবন, সম্মান ও উদ্দেশ্যের আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়। শুধু বস্তুগত সমৃদ্ধি মানুষের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে না। এই অপূর্ণতাই ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক সংঘাতের উৎস হতে পারে।
ফুকুয়ামার বর্তমান অবস্থান তাই তার বিখ্যাত ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ ধারণাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার নয়, বরং পুনর্বিবেচনা। তার মতে, উদার গণতন্ত্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক আদর্শগুলোর একটি; কিন্তু ইতিহাস থেমে যায়নি। নতুন রাজনৈতিক শক্তি, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং মানুষের স্বীকৃতি ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা ভবিষ্যতের রাজনীতিকে নতুনভাবে রূপ দিতে পারে।