ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বুধবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের হালনাগাদ তথ্যে এ তথ্য উঠে এসেছে। দ্রুত বাড়তে থাকা ঋণ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর কমানোর সমন্বয় বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যয় সংকোচন ও দক্ষতার পক্ষে কথা বলা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে বেসরকারি সংস্থা ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি গত বছরের শুরু থেকে আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ ফেডারেল চাকরি ছাঁটাই করেছে এবং বৈশ্বিক সাহায্য কমিয়ে দিয়েছে।
২০২৩ সালের মে মাসে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও) পূর্বাভাস দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ২০২৮ সালে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। কিন্তু সেই সময়ের পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় দুই বছর আগেই এই সীমা অতিক্রম করল দেশটি।
বাজেট পর্যবেক্ষক সংস্থা কমিটি ফর এ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের (সিআরএফবি) প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, ‘৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ শুধু সরকারের হিসাবের খাতায় নেই; এটি পুরো অর্থনীতিতে অনুভূত হয় এবং কোনো না কোনোভাবে তা মানুষের পকেটেও পৌঁছে যায়।’
কতটা দ্রুত বাড়ছে ঋণ?
২০২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ আগের কয়েক দশকের তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ ছিল প্রায় ১৯.৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ওই সময়ের তুলনায় বর্তমানে ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সরকারি ঋণ বেড়েছিল প্রায় ৭.৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই ছিল করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলার ব্যয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর এখন পর্যন্ত ঋণ বেড়েছে আরও প্রায় ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। দুই মেয়াদ মিলিয়ে ট্রাম্পের সময়েই ঋণ বেড়েছে প্রায় ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ও ব্যাপক ঋণগ্রহণ ও সরকারি ব্যয় অব্যাহত ছিল। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার।
চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ মাসেরও কম সময়ে আরও ১ ট্রিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে।
তুলনায়, ১৯৮১ সালে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে প্রায় ২০০ বছর লেগেছিল।
সিবিওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ২০২৬ সালে জিডিপির প্রায় ১০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩৬ সালে ১২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল ১০৬ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ কেন ফুলেফেঁপে উঠছে—
সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত ব্যয়
গত দুই দশকে দুটি বড় সংকট—২০০৭-০৯ সালের মন্দা এবং ২০২০-২৩ সালের কোভিড-১৯ মহামারি—সরকারকে ব্যাপক ঋণ নিয়ে ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করেছে। ২০১৭ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে মহামারি মোকাবিলার ব্যয়ের সম্পর্ক রয়েছে।
রাজস্বের তুলনায় ব্যয় বেশি
কর ও অন্যান্য সরকারি রাজস্বের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি হওয়াও ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশেষ করে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের প্রশাসনই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কিংবা রাজস্ব বাড়িয়ে এই ঘাটতি কমাতে ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ যায় সামাজিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ার ও মেডিকেইডসহ স্বাস্থ্যবিমা এবং সাবেক সেনাসদস্যদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবায়।
রাজস্ব দিয়ে এই বিপুল ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে, চলতি বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ব্যক্তি আয়কর, সামাজিক বীমা, করপোরেট করসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ৩৩৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেয়েছে। কিন্তু একই সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিমা, জাতীয় প্রতিরক্ষা ও ঋণের সুদ পরিশোধসহ বিভিন্ন খাতে সরকার ৭৬৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে—যা রাজস্বের প্রায় দ্বিগুণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ কার কাছে
যুক্তরাষ্ট্রের মোট ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ঋণের বড় অংশই দেশের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেওয়া। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ বা প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার জনসাধারণের কাছে থাকা ঋণ।
এর মধ্যে প্রায় ২১ ট্রিলিয়ন ডলার বিভিন্ন দেশীয় ঋণদাতার কাছে পাওনা। এর মধ্যে রয়েছে—
• ফেডারেল রিজার্ভ: ৪ দশমিক ৫২৮ ট্রিলিয়ন ডলার
• মিউচুয়াল ফান্ড: ৫ দশমিক ১৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার
• পেনশন ফান্ড: ১ দশমিক ১৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার
• অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকার: ১ দশমিক ৬৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার
• বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আমানতকারী প্রতিষ্ঠান: ২ দশমিক ০৮৩ ট্রিলিয়ন ডলার
• অন্যান্য করপোরেট ও ব্যক্তিগত ঋণদাতা: ৬ দশমিক ৬৬০ ট্রিলিয়ন ডলার
আন্তর্জাতিকভাবেও যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণ রয়েছে বিভিন্ন দেশ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে। ১৯৭০ সালে বিদেশি ঋণদাতাদের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণের মাত্র ৫ শতাংশ ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে সেই হার বেড়ে ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এর অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি বিনিয়োগের সুবিধা পেলেও দেশটির আয়ের বড় একটি অংশ সুদ হিসেবে বিদেশে চলে যাচ্ছে।
২০২৫ সালের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিদেশি ঋণদাতাদের মধ্যে রয়েছে—
• জাপান: ১ দশমিক ২০৩ ট্রিলিয়ন ডলার
• যুক্তরাজ্য: ৮৮৯ বিলিয়ন ডলার
• চীন: ৬৮৩ বিলিয়ন ডলার
এ ছাড়া আরও ৩০টির বেশি দেশ ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ রয়েছে।
অন্যদিকে, মোট জাতীয় ঋণের প্রায় ২০ শতাংশ বা প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার সরকারের বিভিন্ন সংস্থার একে অপরের কাছে পাওনা। এটিকে আন্তঃসরকারি ঋণ বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বাড়তে থাকা ঋণের প্রভাব কী?
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণের লাগাম টানা না গেলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। এর ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বা সুদের হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা
এমএমআর