২০১১ সালের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিপর্যয়ের পর এই প্রথমবারের মতো জাপানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে। নিগাতা প্রদেশের কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পারমাণবিক কেন্দ্রের জাপানি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার (টেপকো) জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যার পর একটি রিঅ্যাক্টর চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রটি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ এখনো দূর হয়নি।
গত মাসে নিগাতা প্রদেশের গভর্নর কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। কিন্তু এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জনমত বিভক্ত। গত সেপ্টেম্বরে করা এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ স্থানীয় বাসিন্দা পুনরায় চালুর বিপক্ষে, আর ৩৭ শতাংশ পক্ষে মত দিয়েছেন।
চূড়ান্ত অনুমোদনের পর টেপকো জানায়, তারা বুধবার সন্ধ্যা ৭টার পর নিয়ন্ত্রণ রড সরিয়ে রিঅ্যাক্টর চালু করতে চায়। যদিও কাশিওয়াজাকি-কারিওয়ার সাতটি রিঅ্যাক্টরের মধ্যে আপাতত মাত্র একটি চালু হচ্ছে।
মঙ্গলবার তীব্র শীতের মধ্যেও কয়েক ডজন মানুষ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রবেশপথে বিক্ষোভ করেন। স্থানীয় বাসিন্দা ইউমিকো আবে বলেন, কাশিওয়াজাকিতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ টোকিওতে পাঠানো হয়, অথচ ঝুঁকি নিতে হয় স্থানীয়দের—যা তাঁর কাছে অযৌক্তিক।
২০১১ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর ফুকুশিমা দাইইচি কেন্দ্রে রিঅ্যাক্টর গলে যাওয়ার ঘটনার পর জাপান পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে অনেকটাই সরে আসে এবং এই কেন্দ্রটিও তখন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জাপান আবার পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিও এ উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ফুকুশিমা-পরবর্তী কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ডের আওতায় ইতোমধ্যে জাপানের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে ১৪টি রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু হয়েছে। কাশিওয়াজাকি-কারিওয়ার এই ইউনিটটি হবে টেপকোর পরিচালনায় ২০১১ সালের পর প্রথম পুনরায় চালু হওয়া রিঅ্যাক্টর।
টেপকো জানিয়েছে, কেন্দ্রটিতে ১৫ মিটার উঁচু সুনামি প্রতিরোধ দেয়াল, উঁচু স্থানে জরুরি বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা উন্নয়ন যুক্ত করা হয়েছে। তবুও বাসিন্দারা বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন। তাদের অভিযোগ, অতীতে তথ্য গোপন, ছোটখাটো দুর্ঘটনা এবং অপর্যাপ্ত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
৮ জানুয়ারি পুনরায় চালুর বিরোধিতা করে সাতটি সংগঠন প্রায় ৪০ হাজার স্বাক্ষরসহ একটি পিটিশন টেপকো ও পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়। পিটিশনে বলা হয়, কেন্দ্রটি একটি সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত এবং ২০০৭ সালেও এখানে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের পারমাণবিক খাতে একাধিক কেলেঙ্কারি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ শনিবার টেপকো স্বীকার করে, পরীক্ষার সময় কেন্দ্রের একটি অ্যালার্ম ব্যবস্থা কাজ করেনি।
টেপকোর প্রেসিডেন্ট তোমোআকি কোবায়াকাওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এ খাতে জড়িতদের কখনোই আত্মতুষ্ট হওয়া উচিত নয়। বর্তমানে জাপানের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় কয়লা, গ্যাস ও তেল থেকে। সরকার আগামী ১৫ বছরে নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে এই হার ৩০–৪০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নিয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসবে পারমাণবিক শক্তি থেকে।
অন্যদিকে, ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ও পরিষ্কার করার দীর্ঘ ও জটিল কাজ এখনও জাপানের সামনে রয়ে গেছে, যা শেষ হতে আরও কয়েক দশক সময় লাগতে পারে।
সূত্র: এএফপি
এসআর