চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠা পারিবারিক মালিকানাধীন ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন নতুন ধরনের সংকটে পড়েছে। প্রতিষ্ঠাতা প্রজন্ম অবসরে যাওয়ার বয়সে পৌঁছালেও তাদের সন্তানদের একটি বড় অংশ পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নয় বা আগ্রহী নয়। ফলে দেশটির বেসরকারি শিল্প খাতে প্রজন্মান্তরের নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছে।
চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে ছোট পারিবারিক কারখানা ও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে ঝেজিয়াং প্রদেশের ওয়েনঝৌ শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘ওয়েনঝৌ মডেল’ একসময় পারিবারিক যোগাযোগ, নিজস্ব অর্থায়ন ও ছোট কারখানার মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির পথ তৈরি করেছিল। এসব প্রতিষ্ঠান পরে বড় কারখানায় রূপ নেয় এবং চীনকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করতে ভূমিকা রাখে।
ওয়েনঝৌর একটি জুতা কারখানার উদ্যোক্তা আয়ু। তিনি জানান, ১৯৮০-এর দশকে তিনি তিনতলা বাড়ির নিচতলায় বাবা-মাকে হাতে তৈরি চামড়ার জুতা বানাতে দেখেছেন। কয়েক দশকের মধ্যে সেই ছোট পারিবারিক কর্মশালা প্রায় ৭০০ কর্মীর কারখানায় পরিণত হয়। কিন্তু এখন তার প্রজন্মের সামনে সেই ব্যবসা ধরে রাখার প্রশ্নটি অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।
আয়ুর মতে, বর্তমান বাজার তার বাবা-মায়ের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। শুধু সম্পদের উত্তরাধিকার পেলেই ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠাতাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং বাজার সম্পর্কে যে বাস্তব জ্ঞান ছিল, সেগুলো কাগজে-কলমে উত্তরাধিকার হিসেবে হস্তান্তর করা যায় না। ফলে অনেক উত্তরসূরি ব্যবসার মালিক হলেও কার্যত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ লোকজন ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক হারিয়ে ফেলছেন।
মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক হানছিং ফাং বলেন, প্রতিষ্ঠানের শেয়ার এক রাতেই ছেলে বা মেয়ের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তারা এমন একটি প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করেন, যা কাগজে একটি কোম্পানি হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল। সেই নেটওয়ার্ক উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কঠিন।
এই সংকটের পরিসর বোঝাতে বিভিন্ন গবেষণার তথ্য সহায়ক। এইচএসবিসি লাইফের এক গবেষণা অনুযায়ী, চীনের দুই-তৃতীয়াংশ ধনী ব্যক্তির কোনো উত্তরাধিকার পরিকল্পনা নেই। আবার নিংবো বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণায় ১১৪টি বেসরকারি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্যরা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন।
চীনের তরুণ ব্যবসায়ী উত্তরসূরিদের অনেকেই পারিবারিক ব্যবসা গ্রহণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এক তরুণ বিপণনকর্মী জানান, তার পরিবারের শানওয়ে শহরে একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা এবং শেনঝেন ও হংকংয়ে কয়েক ডজন দোকান রয়েছে। তারপরও তিনি এখনই পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিতে চান না। তার মতে, ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আর্থিক বিষয় ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর মতো প্রস্তুতি তার এখনো হয়নি।
চীনের বেসরকারি খাত দেশটির অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বেসরকারি খাত দেশের কর রাজস্বের অর্ধেকের বেশি এবং মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। ফলে পারিবারিক ব্যবসাগুলোর প্রজন্মান্তরের হস্তান্তর ব্যর্থ হলে এর প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৃহত্তর অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, হাজার হাজার পারিবারিক ব্যবসা যদি উত্তরসূরি সংকটের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে চীনের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সমস্যা শুধু ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার নয়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, প্রতিষ্ঠাতাদের কয়েক দশকে গড়ে তোলা দক্ষতা, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক ও ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সম্পর্ক নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে হস্তান্তর না হওয়া।
তবে তরুণ প্রজন্মের সবাই পারিবারিক ব্যবসা ছেড়ে দিতে চাইছে—বিষয়টি এমন নয়। অনেকেই ভবিষ্যতে পরিবারের ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছেন না। কিন্তু তাদের বক্তব্য, উত্তরাধিকার মানে শুধু সম্পদ পাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিপুল দায়িত্ব, জটিল সম্পর্ক এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা।
চীনের পারিবারিক শিল্পের সামনে তাই এখন মূল প্রশ্ন হলো—প্রথম প্রজন্ম যে শ্রম, সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, দ্বিতীয় প্রজন্ম কি সেই অদৃশ্য সম্পদও উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে? দেশটির অর্থনীতিতে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বিবেচনায় এ প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।