চীনের দুটি প্রধান মরভূমির বিস্তার রোধ করতে ৪৮ বছর সেখানে বনায়নের পরিকল্পনা নেয় সরকার। সবুজ মহাপ্রাচীন প্রকল্পে মরভূমিতে রোপণ করা হয় ৬৬ বিলিয়নেরও বেশি গাছ। সেই গাছ প্রাকৃতিক বনের গাছের চেয়ে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, এখানকার গাছগুলো নিজেদের বৃদ্ধির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি কার্বন শোষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করছে। এমনটাই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
দেশটি তার ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ বা সবুজ মহাপ্রাচীন প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৯৭৮ সাল থেকে ৬৬ বিলিয়ন গাছ লাগিয়েছে। এ কাজের লক্ষ্য হলো গোবি এবং তাকলামাকান মরুভূমির বিস্তারকে ধীর করা। ২০৫০ সালের মধ্যে আরো ৩৪ বিলিয়ন গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষের। এই গাছগুলো বনে জন্মানো গাছ থেকে কীভাবে ভিন্ন ধরনের হলো, তা নিয়ে গবেষণা করার সিদ্ধান্ত নেন বিজ্ঞানীরা । গবেষণায় দেখা গেছে, রোপণ করা গাছগুলো প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং প্রাকৃতিক গাছের তুলনায় এদের পাতার ক্ষেত্রফল ৬৬ শতাংশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
গবেষকরা এখনো জানেন না এই গাছগুলো প্রাকৃতিক গাছ থেকে ঠিক কীভাবে আলাদা। গবেষণাটির প্রধান লেখক শেনঝেনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউহাং লুও লাইভ সায়েন্সকে বলেছেন, ‘বেশিরভাগ বৈশ্বিক ইকোসিস্টেম মডেল বনের গাছপালার প্রকারভেদের মধ্যে পার্থক্য করে না।’ তাই তারা বুঝতে চেয়েছিলেন রোপিত ও প্রাকৃতিক বনের মধ্যকার পার্থক্যগুলো বিশেষ করে গাছের প্রজাতির বৈচিত্র্য, ঘনত্ব এবং একটি গাছের বয়সের কীভাবে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক বনের গাছের চেয়ে মরভূমির গাছ ৬৬ শতাংশ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে গবেষকরা এই গাছগুলো কত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, তা নির্ধারণ করতে লিফ এরিয়া ইনডেক্স (পাতার ক্ষেত্রফল সূচক) পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ সূচকটি হলো ক্যানোপি ঘনত্বের একটি পরিমাপ এবং কার্বন শোষণের একটি প্রধান চালিকাশক্তি।
রোপিত বন হলো মানুষের দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা বন, যেমন গ্রিন গ্রেট ওয়াল প্রকল্প; অন্যদিকে প্রাকৃতিক বন মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই গড়ে ওঠে।
ফলাফলে সুস্পষ্ট পার্থক্য উঠে এসেছে। যেখানে দেখা গেছে রোপণ করা গাছগুলো প্রাকৃতিক গাছের চেয়ে ৬৬ শতাংশ দ্রুত তাদের পাতার ক্ষেত্রফল বাড়িয়েছে। গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, সম্ভবত তাদের বয়সের পার্থক্যের কারণেই এমনটা হয়েছে। রোপণ করা গাছগুলো কম বয়সি এবং সেগুলো সাধারণত দ্রুত বৃদ্ধি পায়। গবেষকরা একই বয়সের বনগুলোর সঙ্গেও তুলনা করে দেখেছেন তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য কি-না। আশ্চর্যজনকভাবে তারা দেখেছেন রোপণ করা গাছগুলো তখনো চার দশমিক ছয় শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এর প্রধান কারণ হলো রোপণ করা গাছ মানুষের হস্তক্ষেপে বেড়ে ওঠে, যেখানে বনের গাছগুলো পানি ও সূর্যালোকের জন্য লড়াই করে। রোপিত গাছগুলোর মধ্যে সাধারণত ইউক্যালিপটাস এবং পপলারের মতো দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেখানে প্রতিযোগী গাছপালা ছেঁটে ফেলা হয় এবং মাটিতে নিয়মিত সার প্রয়োগ করা হয়। ফলে এই গাছগুলোকে পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টির জন্য লড়াই করতে হয় না।
তবে একটি নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পর থেকেই রোপিত গাছগুলোর বৃদ্ধি কমতে শুরু হয়। ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সে এগুলোর বৃদ্ধি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং তারপর কমতে থাকে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক বনে গাছপালা ধীরে ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। লুও বলেন, ‘কার্বন শোষণের জন্য রোপিত বন একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি হাতিয়ার; কিন্তু এই সুবিধা কেবলই অস্থায়ী। তবে দীর্ঘমেয়াদি কার্বন সঞ্চয় ও স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বন অপরিবর্তনীয়।’
এসআর