প্রায় দুই দশক ধরে চলা আফগান যুদ্ধের একটা বড় অংশজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চেয়েও কঠিন ছিল সেখান থেকে সরে আসা। পাঁচ বছর আগে রোববার বিশৃঙ্খলা ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তালেবান যোদ্ধাদের হাত থেকে পালাতে মরিয়া হয়ে লাখো আফগান কাবুল বিমানবন্দরে ভিড় করেছিলেন। সেখানে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১৩ মার্কিন সেনা নিহত হন।
কিন্তু এরপর থেকে, যে ভয়গুলোর কারণে তিনজন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেননি, তা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। আফগানিস্তান কোনো সন্ত্রাসী স্বর্গ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর কোনো উড্ডয়ন কেন্দ্র (লাঞ্চপ্যাড) হয়ে ওঠেনি।
এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও সামরিক বিজয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ দেখাচ্ছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কখনো কখনো যুদ্ধ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পরে আবার অবস্থান বদলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
বসন্তে এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমাদের সেখানে থাকতেই হবে এমন নয়। আমাদের তাদের তেলের প্রয়োজন নেই। তাদের কাছে থাকা কোনো কিছুরই আমাদের প্রয়োজন নেই। তবে আমরা আমাদের মিত্রদের সহায়তা করতে সেখানে আছি।’
আফগানিস্তানের এই দীর্ঘ যুদ্ধটি ইরানের বিষয়ে ভবিষ্যৎ পথ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা জেনারেল এবং নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে: আফগানিস্তানে যুদ্ধ বন্ধ করা কেন এত কঠিন ছিল?
আর সেখানে পরাজয় মেনে নিতে দীর্ঘ সময় লাগার অভিজ্ঞতা ইরান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান সংকট সম্পর্কে কী বলে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থানের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো যুদ্ধ লড়েছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই যুদ্ধ বন্ধ করার বা সরে আসার প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান র্যান্ড করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু আর. হোয়েন বলেন, ‘গত কয়েক দশক ধরে আমরা যে যুদ্ধগুলোতে জড়িয়ে আছি তার বেশিরভাগই মূলত ‘সাম্রাজ্যের পাহারা দেওয়া। হোহন বলেন, আমরা কোনো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে যুদ্ধ করছি না।’
বিন লাদেনের মৃত্যুর পরেও চলেছে যুদ্ধ
২০১১ সালের মে মাসে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর আফগানিস্তান থেকে সরে আসার সবচেয়ে ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এক দশকের ড্রোন হামলায় আল-কায়েদাও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে আফগানিস্তান শাসন করা এবং আল-কায়েদাকে আশ্রয় দেওয়া তালেবানকে নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
আফগানিস্তানে মার্কিন কমান্ডারদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা কার্টার মালকাসিয়ান পরে লিখেছেন, তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বর্তমান জ্ঞান থাকলে তিনি এবং আরও অনেক মার্কিন কর্মকর্তা আগেই সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে আরও জোরালো অবস্থান নিতেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষা দপ্তর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল কয়েকটি কারণে—বিশ্বমঞ্চে মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ, এবং বিশ্বস্ত আফগান মিত্রদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পরাজয় মেনে নিলে নিহত ও আহত সৈন্যদের ত্যাগকে অসম্মান করা হবে—এমন অনুভূতির কারণে।
মালকাসিয়ানের মতে, বহু সামরিক কর্মকর্তার কাছে যুদ্ধ ছেড়ে দেওয়া তাদের বছরের পর বছর ধরে পাওয়া প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার বিপরীত ছিল। তিনি লিখেছেন, ‘সহজভাবে বললে, আমেরিকানরা আগে আফগানিস্তান ছাড়েনি কারণ মার্কিন সামরিক বাহিনী জয়ের জন্যই লড়াই করে।’
ইরান যুদ্ধেও কি একই পরিণতি?
রাজনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক নেতারা বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার গ্রহণযোগ্যতা এবং যুদ্ধে হেরে গেলে ব্যালট বাক্সে তাদের কী ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন।
২০১১ সাল নাগাদ আফগানিস্তানে মার্কিন সেনার সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল। তালেবানরা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের কেবল মার্কিন সেনা এবং যুদ্ধের খরচ বহনে ক্লান্ত আমেরিকান জনগণের ধৈর্য্যের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকতে হবে। তালেবানকে পরাজিত করার সম্ভাবনা যত ক্ষীণ হয়েছে, মার্কিন নীতিনির্ধারকেরাও ততই যুদ্ধের লক্ষ্য পরিবর্তন করেছেন। তারা হতাহতের সংখ্যা কমানো, যুদ্ধের ব্যয় কমানো এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ও অজনপ্রিয় আফগান সরকারকে টিকিয়ে রাখার দিকে মনোযোগ দেন।
পরিমিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রচারকারী ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের ডিরেক্টর রোজমেরি কেলানিক বলেন, ‘তারা আইসিইউ-এর সেই ডাক্তারের মতো যিনি জানেন যে রোগী মারা যাবে। তারা কেবল আশা করছেন যেন রোগী তাদের ডিউটি বা শিফটের পরে মারা যায়। তারা চান না এটি তাদের দায়িত্বপালনকালীন সময়ে ঘটুক’।
ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর যুদ্ধ আরো এক দশক ধরে চলেছিল এবং আরো ৮৬৮ জন মার্কিন সেনা সদস্যের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। যুদ্ধের শেষ বছরগুলোতে নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন কমান্ডাররা বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাদের ব্যর্থ হওয়ার জন্য নিয়োজিত করা হচ্ছে। আফগানিস্তানের শেষ কমান্ডার জেনারেল অস্টিন এস. মিলার ২০১৮ সালে যখন এই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নির্বাচিত হন, তখন তিনি নিজের সেই সময়ের মানসিকতা স্মরণ করে বলেছিলেন যে তিনি আশা করেছিলেন তার এই দায়িত্বপালন শেষে তিনি ‘খুবই ক্লান্ত’ হয়ে ফিরবেন এবং তার ‘মর্যাদা হ্রাস পাবে’।
কিন্তু আফগানিস্তানের সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর এবার ইরান যুদ্ধেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি বছরের শুরুতে বলেছিলেন, ইরানের যুদ্ধ আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধের মতো হবে না। তিনি নিজেও তরুণ আর্মি ন্যাশনাল গার্ড কর্মকর্তা হিসেবে ওই দুই যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার ভাষায়, সেসব যুদ্ধ ছিল ‘জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী ফাঁদ’। ইরানের ক্ষেত্রে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অভিযান হবে ‘লেজার-ফোকাসড’, প্রাণঘাতী, দ্রুত এবং ‘নির্ণায়ক’।
তিনি বলেছিলেন, ‘এটি ইরাক নয়। এটি অন্তহীন নয়।’
কিন্তু ইরান মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পরে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেন, শুধু মার্কিন বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরানকে পরাজিত করা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
এখন মার্কিন প্রশাসন হরমুজ প্রণালিতে ইরানের রপ্তানির ওপর নৌ অবরোধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বিমান হামলায় ব্যর্থ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে। কিছু জাহাজ ও তেল রপ্তানি আবার প্রণালি দিয়ে চলাচল শুরু করার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেলেও, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা আর দ্রুত বিজয়ের কথা বলছেন না। বরং তারা কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে ইরানকে চাপে রাখার অভিযানের কথা বলছেন।
নৌবাহিনী দীর্ঘদিনের মোতায়েনে এমনিতেই চাপে রয়েছে। এরপরও কতদিন অবরোধ চালিয়ে যেতে পারবে—এ প্রশ্নের জবাবে হেগসেথ বলেছেন, ‘যতদিন প্রয়োজন, ততদিন—অনির্দিষ্টকাল।’
যুদ্ধ ছাড়ার খরচও কম নয়
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক বাহিনীর চ্যালেঞ্জ আফগানিস্তানের মতোই। তালেবান তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়েছিল; ইরানের নেতারাও এখন নিজেদের টিকে থাকার জন্য লড়ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। ফলে যুদ্ধ থেকে সরে আসার রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্যও আফগানিস্তানের তুলনায় কম হতে পারে।
সামরিক বিশেষজ্ঞ থমাস জি. মাহনকেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারে। যুদ্ধ শুরুর আগে নৌপথটি খোলাই ছিল। তবে ইরান কয়েক দশক ধরে ওই এলাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ও শক্তিশালী করেছে। তাই সেখানে স্থলবাহিনী নামিয়ে অভিযান চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এমন অভিযানে প্রাণ ও অর্থের যে মূল্য দিতে হবে, তা ট্রাম্প কিংবা যুদ্ধবিরোধী মার্কিন জনগণ কতটা মেনে নেবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন।
আফগানিস্তানের পরাজয়কে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন
আফগান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পাঁচ বছর পূর্তিতে বুধবার তিনজন অবসরপ্রাপ্ত মেরিন সেনাকে বীরত্বের জন্য উন্নীত পদক দেন হেগসেথ। তাদের মধ্যে দুজন কাবুল বিমানবন্দরে আত্মঘাতী হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন। আহত অবস্থাতেও তারা অন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেছিলেন।
অনুষ্ঠানে হেগসেথ তাদের বীরত্বের প্রশংসা করেন। তবে একই সঙ্গে অনুষ্ঠানটির আরেকটি উদ্দেশ্যও ছিল—দীর্ঘ ও হতাশাজনক আফগান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরাজয়কে সেখানে দায়িত্ব পালনকারী সেনাদের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে তুলে ধরা।
হেগসেথ মেরিন সেনাদের উদ্দেশে বলেন, তারা একটি ‘প্রাণঘাতী, গর্বিত ও অপরাজিত বাহিনীর অগ্রভাগ’। তাদের দীর্ঘদিনের প্রাপ্য পদকও দেওয়া হয়। তবে পুরো অনুষ্ঠানে একটি বিষয় অনুচ্চারিতই থেকে যায়—আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল।
এমএমআর