জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)-এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে দলটির সমর্থন এতটাই বেড়েছে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো কোনো রাজ্যে উগ্র ডানপন্থীরা এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এএফডির উত্থান ঠেকাতে জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সাহসী ও কার্যকর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকল্প সামনে আনতে হবে।
আগামী সপ্তাহে স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে এএফডির সমর্থন ৪০ শতাংশের বেশি দেখা যাচ্ছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় দলটির সমর্থন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য-ডানপন্থী খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন বা সিডিইউর সমর্থন প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। এমন ফল এলে এএফডি পর্যাপ্ত আসন পেয়ে এককভাবে রাজ্য সরকার গঠন করতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ১৬টি রাজ্যের কোনোটি এখন পর্যন্ত উগ্র ডানপন্থী দলের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি। এএফডি সরকার গঠন করলে শিক্ষা, পুলিশ ও সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা থাকবে। স্যাক্সনি-আনহাল্টের এএফডিকে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে শরণার্থী শিশুদের আলাদা স্কুলে পাঠানো, নাৎসি আমলের ইতিহাস শিক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে জাতীয়তাবাদী শিক্ষাক্রম চালু করা এবং তথাকথিত ‘স্বাভাবিক পরিবারকে’ অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো প্রস্তাব রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়েও এএফডির অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি চারজনের বেশি ভোটারের একজন এমন একটি দলকে সমর্থন করছেন, যে দলটি ‘রিমিগ্রেশন’ বা অভিবাসী ও বিদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের বড় পরিসরে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে জার্মান নাগরিকত্বধারী এমন ব্যক্তিরাও পড়তে পারেন, যাদের বংশগত পরিচয়কে ‘অ-জার্মান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এএফডির সঙ্গে মূলধারার দলগুলোর সহযোগিতার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষেও কিছু মত সামনে এসেছে। যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, ক্ষমতায় গেলে বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে দলটির জনপ্রিয় প্রতিশ্রুতিগুলোর সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেতে পারে। তবে এই কৌশল ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
শুধু অভিবাসন প্রশ্নে এএফডির কঠোর অবস্থান অনুকরণ করে দলটির জনপ্রিয়তা কমানো সম্ভব হচ্ছে না। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎসের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার কর কমানো, কল্যাণব্যবস্থায় সংস্কার এবং অবসরের বয়স বাড়ানোর মতো অর্থনৈতিক পদক্ষেপে গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদে জার্মানির অর্থনীতি যখন চাপের মধ্যে, তখন এসব পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগ যথেষ্টভাবে মোকাবিলা করতে পারছে না।
জার্মানির শিল্পাঞ্চলগুলোতে এএফডির সমর্থন বিশেষভাবে বেশি। একসময় এসব অঞ্চল দেশটির শিল্প, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট, শিল্পে প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে এসব এলাকার মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষই উগ্র ডানপন্থীদের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে।
ফ্রিডরিশ মেরৎস ২০১৮ সালে সিডিইউর নেতৃত্বের জন্য প্রচারণার সময় এএফডির ভোট অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দলটির সমর্থন কমার পরিবর্তে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে মেরৎসের জনপ্রিয়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং তাঁর জোটসঙ্গী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিও জনমত জরিপে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
এএফডির উত্থান শুধু অভিবাসন বা সাংস্কৃতিক ইস্যুর ফল নয়; এর পেছনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিল্পাঞ্চলের সংকট এবং মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের হতাশাও কাজ করছে। তাই উগ্র ডানপন্থীদের মোকাবিলায় শুধু তাদের বক্তব্যের অনুকরণ না করে কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক আস্থার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে কার্যকর বিকল্প নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।