ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আন্দোলনের কারণে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী সরাসরি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে ক্লাস করতে পারছে না বলে জানিয়েছে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়। খবর আনাদোলুর।
বুধবার ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানান, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শিক্ষার পরিবেশ ও বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরুর পর ২১৫ শিক্ষার্থী এবং ৮৮ জন শিক্ষা কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়েছেন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, আহত শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই বেপরোয়া আচরণ কিংবা বিস্ফোরক নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন। অন্যদিকে আহত শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রায় অর্ধেকই স্কুলের প্রধান বা উপপ্রধান। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানান জেফ্রে।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি ফ্রান্স আগে কখনো দেখেনি।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর দপ্তরের পরিসংখ্যানের বরাতে সংবাদপত্র ল্য ফিগারো জানিয়েছে, আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে ৭১৫ পুলিশ ও জেনদার্ম সদস্যও আহত হয়েছেন।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২৪টি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অগ্নিসংযোগ বা ব্যাপক ভাঙচুর হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে তাৎক্ষণিকভাবে ক্লাস চালু করা সম্ভব হচ্ছে না এবং প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী সরাসরি শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হতে পারছে না।
জেফ্রে এটিকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে ‘বড় ধরনের ক্ষতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া আরও কয়েকশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ২ থেকে ৩ কোটি ইউরো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্দোলনে বিস্ফোরক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
এদিকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশকে ব্যবহৃত কিছু বিস্ফোরক গ্রেনেড না ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। এর আগে এক বিক্ষোভে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর হাত উড়ে যাওয়ার ঘটনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নুনেজ বলেন, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ক্ষেত্রে এসব গ্রেনেডের ব্যবহার বন্ধ করতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।
আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় পুলিশের আচরণ খতিয়ে দেখতে ফ্রান্সের পুলিশ তদারকি সংস্থা আইজিপিএন ১৮টি তদন্ত শুরু করেছে বলেও জানান তিনি। তদন্তের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ পরিস্থিতির তুলনায় যথাযথ ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা হবে।
নুনেজ বলেন, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা প্রয়োজন হলেও তাদের পদক্ষেপ অবশ্যই পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রাপ্তবয়স্কদের আন্দোলনের মতো করে মোকাবিলা করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে নুনেজ জানান, আন্দোলন মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হওয়ার এবং সরকারের অবস্থান সম্পর্কে তাদের বেশি ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ম্যাক্রোঁ। একই সঙ্গে গুরুতর সহিংসতা হলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলন ঘিরে ৬ হাজার ৫৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
৫০০-এর বেশি স্কুলে ক্লাস বন্ধ
বুধবার দেশটির ৪৫৯টি স্কুলে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ক্লাস বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগের দিন মঙ্গলবার দেশটির ৩ হাজার ৭০০ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৯১টিতে বিভিন্ন কারণে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ক্লাস বন্ধ ছিল।
উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী ইউনিয়ন ও ছাত্র ইউনিয়ন বুধবারও স্কুল অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার এবং বৃহস্পতিবার প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। প্যারিস ও অন্যান্য শহরে এটিকে আন্দোলনের ‘চতুর্থ ধাপ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বুধবারও প্যারিস, নিস ও লিয়ঁসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। লিয়ঁ অঞ্চলে দিনের শুরুতেই ২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আন্দোলনের প্রভাবে পড়ে এবং সেখানে ১১ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এমএমআর