হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

ইউরোপে তীব্র গরমে ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু

সিএনএন

ইউরোপে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে অনুমান করেছেন গবেষকেরা। এসব মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন, বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা। গবেষকদের দাবি, গত ২৬ বছরের মধ্যে ইউরোপে তাপজনিত মৃত্যুর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এ বছর।

নেচার হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত দুটি গবেষণার ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে। গবেষণায় ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরের তাপমাত্রা ও মৃত্যুঝুঁকি বিশ্লেষণ করেছেন ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষকেরা।

জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত এসব শহরে তাপজনিত কারণে আনুমানিক ৫০ হাজার ৩৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৬০০-এর বেশি মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি না পেলে এসব মৃত্যুর বড় একটি অংশ এড়ানো সম্ভব হতো।

তবে এই সংখ্যা সরাসরি নথিভুক্ত মৃত্যুর হিসাব নয়। তাপমাত্রা, জনসংখ্যা এবং উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এ অনুমান করেছেন। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শহরগুলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে শহরের বাইরের জনবসতিতে তাপের প্রভাব এই হিসাবের আওতায় আসেনি।

তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙা গ্রীষ্ম

২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে একের পর এক তাপপ্রবাহ আঘাত হানে। মে মাসের শেষ দিক থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত মহাদেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়া বিরাজ করে। পশ্চিম ইউরোপে গ্রীষ্মের গড় তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোনো কোনো দিনে কয়েকটি দেশের তাপমাত্রা ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি উঠে যায়।

বিশেষ করে ১৭ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গবেষকদের হিসাবে, এই সময় সংশ্লিষ্ট শহরগুলোর গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। পুরো গ্রীষ্মে অনুমান করা তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষকেরা বলছেন, ইউরোপের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ঐতিহ্যগতভাবে তুলনামূলক শীতল হিসেবে পরিচিত উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন এলাকাতেও তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল। এতে বোঝা যাচ্ছে, চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি আর শুধু ইউরোপের উষ্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ইতালিতে

দেশভিত্তিক হিসাবে তাপজনিত মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ইতালিতে। সেখানে ১৩ হাজার ৩০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে গবেষকেরা হিসাব করেছেন। এরপর রয়েছে ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানি।

গবেষণায় দেশগুলোর আনুমানিক মৃত্যুর হিসাব এমন—ইতালিতে ১৩ হাজার ৩০৩ জন, ফ্রান্সে ৭ হাজার ২৬৮ জন, স্পেনে ৬ হাজার ৮২৪ জন, জার্মানিতে ৬ হাজার ৩৪০ জন এবং যুক্তরাজ্যে ৪ হাজার ৩৫৪ জন।

যুক্তরাজ্যে অনুমান করা মৃত্যুর মধ্যে ২ হাজার ৫৩৫ জনের মৃত্যুর সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। স্পেনে তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় ৭৭ শতাংশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হয়েছে গবেষণায়।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে প্রবীণেরা

তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রবীণ ব্যক্তিরা। গবেষণার হিসাবে, ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার ৫০২, যা মোট অনুমান করা মৃত্যুর প্রায় ৪৫ শতাংশ।

তবে তীব্র গরমের ঝুঁকি শুধু প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ৬৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ছয় হাজার মানুষেরও তাপজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে গবেষকেরা অনুমান করেছেন। এমনকি ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যেও আট শতাধিক মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে।

অতিরিক্ত তাপ শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। এতে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর চাপ বাড়তে পারে। আগে থেকে হৃদ্‌রোগ, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষের ঝুঁকি আরও বেশি। বয়স্কদের পাশাপাশি বাইরে কাজ করা শ্রমিক, গৃহহীন মানুষ এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিরাও তীব্র গরমে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে

তাপজনিত মৃত্যুর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি শতকের শুরুর দিকে তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে মানবসৃষ্ট উষ্ণতার সম্পর্ক ছিল। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে সেই অনুপাত বেড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে।

এর অর্থ, প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত কারণে গরম পড়লেও মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা সেই তাপকে আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী করে তুলছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বাড়ছে। এতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তাপপ্রবাহের তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও ঘনঘন ঘটার প্রবণতা বাড়ছে।

ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু ও চরম আবহাওয়া গবেষক ক্লেয়ার বার্নস বলেন, ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইউরোপের বহু অঞ্চলে তাপজনিত মৃত্যুর দিক থেকে রেকর্ডের সবচেয়ে ভয়াবহ গ্রীষ্ম হয়ে থাকতে পারে। তার মতে, ক্রমেই বেশি গরম ও চরম আবহাওয়ার কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়ছে। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে প্রাণ হারানো মানুষ এবং শোকাহত পরিবার।

লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষক পিয়ের মাসেলোও সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর কেবল ইউরোপের ঐতিহ্যগতভাবে উষ্ণ অঞ্চলগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের কিছু এলাকাও নজিরবিহীন তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে।

জরুরি অভিযোজন ও নির্গমন কমানোর তাগিদ

গবেষকেরা বলছেন, তাপপ্রবাহের ক্ষতি কমাতে সরকারগুলোর দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রবীণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শহরে শীতল পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিতে হবে।

শহরে গাছপালা ও সবুজ এলাকা বাড়ানো, তাপ শোষণকারী পৃষ্ঠের পরিমাণ কমানো, পর্যাপ্ত ছায়া ও পানির ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত গরমের সময় নিরাপদ শীতল আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করা কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে বাড়িঘর ও হাসপাতালকে তীব্র তাপ মোকাবিলার উপযোগী করে তোলাও জরুরি।

তবে শুধু অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা দিয়ে ঝুঁকি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয় বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। দীর্ঘ মেয়াদে তাপজনিত মৃত্যু কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন দ্রুত হ্রাস করা প্রয়োজন।

ইউরোপের ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী বিপদ নয়; এর প্রভাব ইতিমধ্যে মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। নির্গমন কমানো ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও প্রাণঘাতী গ্রীষ্মের মুখোমুখি হতে পারে ইউরোপ।

বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ম্যাক্রোঁ, কোন পথে আন্দোলন

ইউক্রেনে স্টারলিংকের সংযোগ ফিরিয়ে দিয়েছেন ইলন মাস্ক, দাবি ট্রাম্পের

ভেনেজুয়েলায় অবাধ নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ

প্যারিসে কারফিউয়ের মেয়াদ বাড়ল, দুই শহরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ

ফ্রান্সে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ম্যাক্রোঁ, অবৈধ সমাবেশ নিষিদ্ধের ঘোষণা

ইউরোপে বিক্ষোভকারীদের ওপর বাড়ছে গোয়েন্দা নজরদারি

ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্পসহ বিদেশি নেতাদের মন্তব্য মূর্খতাপূর্ণ: ম্যাক্রোঁ

নিজ দেশে বিক্ষোভের মধ্যেই আকস্মিক সফরে সৌদি গেলেন ম্যাক্রোঁ

ফ্রান্সে বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েন

ফরাসি বিক্ষোভকারীদের নতুন স্লোগান ‘বিসমিল্লাহ’