হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

ফ্রান্সের দাঙ্গা গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ

সিএনএন

ফ্রান্সের প্যারিসের প্লেস দে লা রিপাবলিকের কাছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ। ছবি: সংগৃহীত

ফ্রান্সজুড়ে শুরু হওয়া সহিংস দাঙ্গা দেশটির গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে সামনে এনেছে। কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদহানি ও লুটপাটের পর সরকার পড়েছে চাপের মুখে। একদিকে শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ, অন্যদিকে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ ও দুর্বল অর্থনীতি—সব মিলিয়ে অস্থির পরিস্থিতির মুখে পড়েছে দেশটি। আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এ সংকট আরো ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সোমবার ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেন, ‘খোলাখুলি বলতে গেলে, আমরা এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি।’ তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে তার এ বক্তব্যও যথেষ্ট নয় বলে মনে করা হচ্ছে। সপ্তাহান্তের দাঙ্গায় দেশটির বড় বড় শহরে ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুর হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।

প্যারিস, মার্সেই, বোর্দোসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। দুই বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা সামলে টিকে থাকা লিমোজ শহরের সিটি হলও আগুনে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনটির ঘড়ি-টাওয়ারের চূড়া ধসে পড়েছে।

সপ্তাহান্তের সহিংসতায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে শরৎকালীন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে স্কুলশিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছিল। জরাজীর্ণ স্কুল, শিক্ষকের ঘাটতি ও চাকরির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এসব বিক্ষোভে অংশ নেন। ওই আন্দোলনে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং শতাধিক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আগামী সপ্তাহান্তেও নতুন করে বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে। নভেম্বরে ধর্মঘটের পরিকল্পনা করছে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। ফলে আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ফ্রান্সে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। জনমত জরিপে উগ্র ডানপন্থি প্রার্থী মেরিন লো পেন এগিয়ে রয়েছেন।

রাজনৈতিক অচলাবস্থায় বাড়ছে বিভাজন

রোববার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সহিংসতার নিন্দা করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরেননি তিনি। বরং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সতর্ক করেন। এরপর উপসাগরীয় দেশগুলোতে তিন দিনের সফরে ফ্রান্স ছাড়েন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুও বিরোধীদের ওপর দায় চাপিয়েছেন। উগ্র বামপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশো সরকারের পুলিশি কৌশলের সমালোচনা করে বলেন, সরকারই ‘বিশৃঙ্খলার দরজা খুলে দিয়েছে’। এর জবাবে লেকর্নু বলেন, ‘সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে যারা সহিংসতা চালাচ্ছে, তাদের পক্ষে যুক্তি দেওয়া যায় না। এটি আপনাদের রাজনৈতিক দায়।’

উগ্র ডানপন্থি ন্যাশনাল র‌্যালি দলের প্রার্থী মেরিন লো পেন এ পরিস্থিতিতে অভিবাসন ইস্যু সামনে এনেছেন। তিনি সহিংসতার জন্য ফ্রান্সের দরিদ্র শহরতলি এলাকার অপরাধপ্রবণ তরুণদের দায়ী করেন। এসব এলাকায় দেশটির অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের বসবাস।

লো পেন বলেন, ‘আমাদের দেশ সহিংসতা ও অসহায়ত্বের এক চক্রে আটকে পড়েছে।’ মাখোঁর আমলের বিশৃঙ্খলার মধ্যে কেবল তার কঠোর অবস্থানই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

ন্যাশনাল র‌্যালি দলের সভাপতি জর্ডান বারদেলাও পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ‘অ্যান্টিফা মিলিশিয়া, উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীকে’ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন। ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীর সদস্যরা বিক্ষোভের সময় পরিচয় গোপন রাখতে সাধারণত একই ধরনের কালো পোশাক ও মুখোশ পরেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের রাজনৈতিক বিভাজন দেশটির সংকটকে আরও গভীর করছে। ২০২৪ সালে আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন মাখোঁ। কিন্তু সেই নির্বাচন উল্টো পার্লামেন্টে অচলাবস্থা তৈরি করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ বিভাজন সহজে কাটবে না।

দেশটির রাজনৈতিক মধ্যপন্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সুযোগ নিচ্ছে ন্যাশনাল র‌্যালি এবং মেলঁশোর উগ্র বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবোড। জনসাধারণের ক্ষোভকে পুঁজি করে দল দুটি সমর্থন বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে মাখোঁর একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে বাজেট পাস করাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের আধুনিক ফরাসি ইতিহাসের অধ্যাপক রবার্ট জারেটস্কি আটলান্টিক সাময়িকীতে এক নিবন্ধে লিখেছেন, মধ্যপন্থি প্রার্থীদের সংখ্যা বেশি এবং তাদের বেশির ভাগেরই সমর্থক তুলনামূলক কম। শেষ পর্যন্ত এতে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে এমন দুই প্রার্থীর একজনের জয়ের পথ তৈরি হতে পারে, যাদের ফ্রান্সের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সরকারি ঋণ ও অর্থনৈতিক পতনের শঙ্কা

বর্তমান সংকট ফ্রান্সের আগে থেকেই বিভক্ত সমাজকে আরও মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সপ্তাহান্তের সহিংসতায় ক্ষোভ ও হতাশার পাশাপাশি দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে একধরনের নেতিবাচক মনোভাবও বাড়ছে।

সম্প্রতি ইপসোস-বিভিএর এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৮৫ শতাংশ মনে করেন, ফ্রান্সের অবনতি হচ্ছে। আর ৯৮ শতাংশই দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট।

পরবর্তী সরকার যে দলই গঠন করুক, স্থিতিশীল জোট গঠন করতে পারলেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তাদের হাতে বিকল্প কম থাকবে।

ফ্রান্সের অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে আছে। প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক গ্রীষ্মে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে।

পর্যটন এখনো ফ্রান্সের আয়ের অন্যতম বড় উৎস। তবে গত দুই দিনে দেশটির রাস্তায় সহিংসতার যেসব ভিডিও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। সুদের হার বাড়ার মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিনিয়োগ প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।

তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সরকারি ঋণ নিয়ে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গবেষকেরা জুলাইয়ে বলেন, ‘ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে দেশটির ঋণ আরও বাড়বে বলে আমরা মনে করছি।’

বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছর মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে রেকর্ড ৩৪ হাজার কোটি ইউরো ঋণ নিতে হবে ফ্রান্সকে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত বেড়ে ১১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় হার দ্বিগুণ।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও বেড়েছে। সোমবার ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়।

মেলঁশোর একটি প্রস্তাবও বন্ডবাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তিনি ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা দেশটির সরকারি বন্ডের সুদ স্থগিত করা বা সেগুলোর ঋণ বাতিলের পরিকল্পনার কথা বলেছেন।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের মতে, ২০২৭ সালের নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও রাজনৈতিক বিভাজন অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পরবর্তী সরকার সরকারি অর্থব্যবস্থার সমস্যাগুলো সমাধান না করে বারবার পিছিয়ে দিতে পারে। এতে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ম্যাক্রোঁর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব

ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বদের একজন জেনারেল শার্ল দ্য গল একবার বলেছিলেন, ‘মহত্ত্ব ছাড়া ফ্রান্স, ফ্রান্স হতে পারে না।’

দেশের আন্তর্জাতিক ভূমিকা ও স্বাধীনতা নিয়ে তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিল।

তবে দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্ট থাকার সময় এক সহযোগীকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যত দিন পারি, মঞ্চের নাটক চালিয়ে যাব। এরপর কী হবে, সে বিষয়ে কোনো ভ্রমে থেকো না। সবকিছু আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে।’

১৯৬৮ সালের দাঙ্গার এক বছর পর পদত্যাগ করেছিলেন দ্য গল। ওই দাঙ্গায় ফ্রান্স কেঁপে উঠেছিল। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের ঘটনার তুলনা টানছেন কিছু বিশ্লেষক।

ম্যাক্রোঁ প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় তাকে ফ্রান্সের অবনতি নিয়ে প্রচলিত হতাশাবাদী ধারণার বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল। ফরাসি ভাষায় এ ধারণাকে বলা হয় ‘দেক্লিনিসম’। ২০১৬ সালে প্রকাশিত লারুস অভিধানেও শব্দটি স্থান পেয়েছে।

তখন এক ভাষ্যকার লিখেছিলেন, ম্যাক্রোঁ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ও গঠনমূলক বার্তা দেন। তার বক্তব্যে এমন এক ফ্রান্সের ছবি উঠে আসে, যেখানে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু এক দশক পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপ অনুযায়ী, ম্যাক্রোঁর প্রতি সমর্থন এখন ১৫ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে সংকটে জর্জরিত রাষ্ট্রের কাছে আরো বেশি প্রত্যাশা করছে সাধারণ মানুষ, যদিও সেই প্রত্যাশা পূরণের সামর্থ্য সরকারের ক্রমেই কমছে। ফ্রান্সের অবনতি নিয়ে হতাশাবাদী ধারণাও জনপরিসরে জোরালোভাবে ফিরে এসেছে।

এএম

অস্ট্রেলীয় এমপিকে গাড়িচাপা দেওয়া ‘পরিকল্পিত’, বলছে পুলিশ

স্পেনে প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা, ৪ জনের প্রাণহানি

ইউক্রেনকে রাশিয়ার কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য করছেন ট্রাম্প: জেলেনস্কি

রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় ১০ লাখ স্থলমাইন কিনতে চায় ফিনল্যান্ড

সহিংস বিক্ষোভের পর ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, ভ্রমণকারীদের সতর্ক করল ইউরোপের একাধিক দেশ

ফ্রান্সে অস্থিরতার মধ্যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারের পক্ষে ইইউ

আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পুলিশ স্টেশনে আগুন

পানির দাবিতে মেক্সিকোতে বিক্ষোভ, সহিংসতা

ইতালিতে বিক্ষোভের আগুন, আহত ১৪১ পুলিশ