ফিনল্যান্ডে দুটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ পেয়েছে গুগল। নির্মাণস্থলে প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সম্পন্ন না করেই কাজ এগিয়ে নেওয়ায় দেশটির কর্তৃপক্ষ এই নির্দেশ দিয়েছে।
উত্তর ফিনল্যান্ডের মুহোস ও কাজানি এলাকায় পরিকল্পিত ডেটা সেন্টার দুটি গুগলের ১৩ বিলিয়ন ইউরোর প্রকল্পের অংশ। অনলাইন অবকাঠামোর জন্য ডেটা সেন্টারের ব্যাপক চাহিদার মধ্যে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একাধিক স্থাপনা নির্মাণ করছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি।
ঘটনাটি সামনে আসে গুগলের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান টুইকে ফিনল্যান্ড ওয়ের বিরুদ্ধে মুহোসে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগেই ৩৩০ হেক্টর (৮১৫ একর) বনভূমি কেটে ফেলার অভিযোগের পর। কাজানিতে প্রায় ২০০ হেক্টর (৪৯৪ একর) জমিতে গাছ কাটার কাজ হয়েছে বলেও জানা গেছে।
ফিনিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর নেচার কনজারভেশন বলেছে, দুটি নির্মাণস্থলের বনভূমি প্রায় ‘বালুর এলাকায়’ পরিণত হয়েছে। নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের ‘অতিরিক্ত উত্তপ্ত’ বাজার পরিস্থিতির কারণে পরিবেশগত নিয়মকানুন উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার ফিনল্যান্ডের লাইসেন্সিং অ্যান্ড সুপারভিশন অথরিটি (এলভিভি) গুগলকে পরিবেশের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে এমন প্রস্তুতিমূলক কাজ ‘অবিলম্বে বন্ধ’ করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে সর্বোচ্চ ২৩ অক্টোবরের মধ্যে এসব কাজ বন্ধ করতে হবে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নির্দেশ কার্যকর থাকবে। এ বিষয়ে আগামী বুধবারের মধ্যে গুগলকে লিখিত ব্যাখ্যাও দিতে হবে।
এলভিভি জানিয়েছে, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এখনো চলছে এবং চলতি বছরের শেষ নাগাদ তা শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এর মধ্যেই গুগল ব্যাপক প্রস্তুতিমূলক কাজ চালিয়েছে। এর মধ্যে গাছ কাটা, মাটির ওপরের স্তর সরানো এবং নির্মাণস্থলে সড়ক তৈরি রয়েছে।
এলভিভির পরিবেশ বিভাগের প্রধান তম্মি মুইলু বলেন, এসব কাজের ফলে পরিবেশের পরিবর্তন হচ্ছে এবং এর প্রভাব তৈরি হচ্ছে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো এ ধরনের প্রভাব চিহ্নিত ও মূল্যায়ন করা।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গুগল নির্দেশনা না মানলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে জরিমানার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
গুগল এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ বুঝতে পারছে এবং এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের নির্ধারিত ‘উচ্চ মান’ বজায় রাখতে পারেনি।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, তারা ফিনল্যান্ডের বন আইন মেনে এবং সৎ উদ্দেশ্যেই কাজ করেছে। গুগল জানিয়েছে, তারা প্রকৃতি নিয়ে জরিপ করেছে এবং পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মুহোসে ১৩০ হেক্টর এলাকায় গাছ লাগানোসহ ভূমি পুনর্বিন্যাস ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ পরিকল্পনাও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ফিনিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর নেচার কনজারভেশনের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা তাপানি ভেইস্তোলা বলেন, দুটি নির্মাণস্থলে যে অনিয়ম হয়েছে, তা ‘পদ্ধতিগত সমস্যা’ বলেই মনে হচ্ছে। মুহোসের নির্মাণস্থল সম্পর্কে তিনি বলেন, জায়গাটি এখন আর বন নেই, সেখানে শুধু বালু পড়ে আছে।
তাঁর মতে, এর অন্যতম কারণ ফিনল্যান্ডে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিপুল চাহিদা। এ কারণে কোম্পানিগুলো দ্রুত কাজ শেষ করতে চাইছে। পাশাপাশি ছোট পৌরসভাগুলোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ভেইস্তোলা বলেন, পুরো পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ হলো ডেটা সেন্টার নির্মাণের ‘অতিরিক্ত উত্তপ্ত বাজার’। এর ফলে কোম্পানিগুলো প্রক্রিয়াগুলো এত দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে যে স্থানীয় প্রশাসনও তা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। একই সঙ্গে পৌরসভাগুলোতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতিও রয়েছে।
ফিনল্যান্ডে গুগলের ডেটা সেন্টার প্রকল্পটি ১৩ বিলিয়ন ইউরোর বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ। সেপ্টেম্বর মাসে গুগল এই বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। প্রকল্পটির আওতায় মুহোস, কাজানি ও ভায়ালা এলাকায় নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের পাশাপাশি হামিনা শহরে বিদ্যমান একটি ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফিনিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বড় ধরনের নির্মাণকাজ বা পরিবেশ পরিবর্তনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষতি চিহ্নিত করা প্রয়োজন। মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগেই বড় আকারে ভূমি পরিবর্তন করা হলে বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। গুগল জানিয়েছে, তারা ফিনিশ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলবে।